এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামানঃ স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম কাণ্ডারী

এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামানের জন্ম ১৯২৬ সালের ২৬ জুননাটোর মহকুমার বাগাতীপাড়া থানার মালঞ্চী রেলস্টেশন সংলগ্ন নূরপুর গ্রামে মামার বাড়িতেপৈতৃক বাড়ি রাজশাহী জেলার কাদিরগঞ্জ মহল্লায়পিতামহ হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার (১৯৪৮-১৯৩৬) গুলাই-এর জমিদার ছিলেনকামরুজ্জামানের বাবা আব্দুল হামিদ মিয়ামা জেবুন নেসা১২ সন্তানের প্রথম কামরুজ্জামান

 

 

পড়াশোনার হাতেখড়ি পরিবারেতারপর প্রাইমারীএরপর ভর্তি হন রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট স্কুলেসেখান থেকে চলে যান চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে১৯৪২ সালে এখান থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পুনরায় রাজশাহী চলে আসেন ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে১৯৪৪ সালে এই কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের স্বীকৃতি পানতারপর উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা যানকলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্স কলেজে ভর্তি হন১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেনকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাঠ শেষ করে তিনি চলে আসেন রাজশাহীতেপুনরায় আইন বিষয়ে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে১৯৫৬ সালে তিনি এখান থেকেই লাভ করেন বি.এল ডিগ্রী অর্জন করেনএরপর যুক্ত হন আইন পেশায়
কামরুজ্জামান পারিবারিকভাবেই রাজনীতির কর্মী ও সংগঠক হয়ে ওঠেনদাদা হাজি লাল মোহাম্মদ সরদার ১৯২৪-২৬, আর ১৯৩০-৩৬ সাল পর্যন্ত দুবার অবিভক্ত বাংলার লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য (এম.এল.সি) নির্বাচিত হয়েছিলেনচরকার প্রচলনে বিশ্বাসী তিনি ছিলেন গান্ধিবাদীকামরুজ্জামানের বাবা আব্দুল হামিদ মিয়া ১৮৮৭-৭৬ ছিলেন রাজশাহীর একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজ সেবক তিনি ১৯৪৬-৫৪ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলাদেশ ও পরে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য ছিলেনদাদা এবং বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শ তার চেতনা মানসকে রাজনৈতিক ধারায় প্রভাবিত করে
পারিবারিক ধারাবাহিকতায় স্কুলে পড়ার সময়ই কামরুজ্জামান জড়িয়ে পড়েন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেযুক্ত হন মুসলিম ছাত্র লীগেসাংগঠিন দক্ষতা ও নৈপূন্যতার কারণে তিনি অল্প সময়ের মধ্যে নেতৃত্বে চলে এসেছিলেন১৯৪২ সালে বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্র লীগের রাজশাহী জেলা শাখার সম্পাদক নির্বাচিত হন১৯৪৩-৪৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় মুসলীম ছাত্র লীগের নির্বাচিত সহ সভাপতি ছিলেন
১৯৫১ সালে কামরুজ্জামান জাহানারাকে সহধর্মিনী করেনবগুড়া জেলার দুপচাচিয়া থানার চামরুল গ্রামের আশরাফ্উদ্দিন তালুকদারের মেয়ে জাহানারাতাদের সংসারে ৬ সন্তানের জন্ম হয়
১৯৫৬ সালে কামরুজ্জামান আওয়ামী লীগে যোগ দেনরাজনৈতিক জ্ঞান, সাংগঠিন দক্ষতা ও নৈপূন্যতার কারণে তিনি আওয়ামী লীগের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা লাভ করেন বঙ্গবন্ধুর৬০র দশকে জেনারেল আইয়ুব খানের শাসনামলে তিনি প্রায় সকল আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেন
১৯৬২ সালের আইয়ুব খানের প্রর্বতিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়, সে আন্দোলনেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা ছিল
১৯৬৬ সালে পরপর দুবার এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামান পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনসারাদেশে এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য দিনরাত অক্লান্ত শ্রম দেন১৯৬৭ সালে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হনওই বছর তিনি বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচিত হন আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির সমর্থনে ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেনসারাদেশে গণঅদ্ভ্যূত্থানে বাস্তবতার কারণে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেএ সময় আইয়ুব খান সমস্যা উত্তরণের পথ হিসেবে রাওয়াল পিন্ডিতে এক গোলটেবিল বৈঠকের আহ্বান করেকামরুজ্জামান আওয়ামী প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে এ বৈঠকে অংশ নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন৷
১৯৭০ সালের নির্বাচনে পুনরায় তিনি রাজশাহী থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৭০ সালে সারাদেশে রাজনৈতিক উন্মাতাল পরিবেশের সৃষ্টি হয়সকল আলোচনা-আন্দোলন যখন অনিবার্যভাবে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে, তখন শেখ মুজিব দলীয় হাই কমান্ড গঠন করেনএ হাই কমান্ডের ৫ জনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন কামরুজ্জামান
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন কামরুজ্জামানশত প্রতিকূলতার মাঝেও আন্তরিকতার সাথে পালন করেছেন নিজ দায়িত্বযুদ্ধকালীন সময় তিনি চষে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের প্রান্ত সীমাসমূহ দেশ স্বাধীনের পর ৩০ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসেন
১৯৭২-৭৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি১৯৭৩ সালে সাধারণ নির্বাচনে তিনি রাজশাহীর দুটি সদর গোদাগাড়ি ও তানর আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসের ১৮ তারিখে তিনি মন্ত্রী পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেনএ সময় তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন১৯৭৫ সালে নতুন মন্ত্রিসভায় তিনি শিল্প মন্ত্রীর দায়িত্ব পানতিনি বাকশালের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করলো মোশতাক গংরা সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রেএর পরে তিন জাতীয় নেতাসহ তাঁকে গ্রেফতার করা হয়ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁকেসহ অন্য নেতাদের আটক রাখা হয়
৩ নভেম্বর ১৯৭৫রাত্রিবেলাকারাগারের নিউ জেল বিল্ডিং এর ২নং রুমে বন্দি এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামানকারাগারে প্রবেশ করে অস্ত্রধারী সৈন্যরানির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় এ.এইচ.এম. কামরুজ্জামানকে

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.