জাহানারা ইমাম: স্বাধীনতা দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য আজীবন লড়েছেন

এ সময় জাহানারা ফ্রক পরে রীতিমতো সাইকেল ও নানা খেলাধুলায় মেতে থাকতেনকিন্তু তাঁর বয়স বারো পেরোতেই সাইকেল চালানো বন্ধ হয়ে গেলোরক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে প্রথা অনুসারে নিষিদ্ধ হয়ে গেলো বাড়ির বাইরে যাওয়াবাবার চাকুরির (ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট) কারণে কখনো সেতাবগঞ্জ, কখনো ঠাকুরগাঁ, কখনো খেপুপাড়া বসবাস করতে হয়েছে তাঁকেবাল্যকাল থেকে তিনি পড়াশুনার পাশাপাশি প্রচুর বই পড়তেন

বাসায় নিয়মিত আসতো পত্রপত্রিকাদৈনিক আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, আজাদ, ষ্টেটসম্যান, সাপ্তাহিক শনিবারের চিঠি, ইলাষ্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়া, মাসিক ভারতবর্ষ, প্রবাসী, বসুমতি আর মোহাম্মদীবাড়িতে কলের গান ছিলোআর ছিলো হারমোনিয়ামসপ্তাহে দু-দিন তাঁকে গানের মাস্টার এসে গান শিখিয়ে যেতেনভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, নারী শিক্ষা আন্দোলন, মুসলিম সমাজের জাগরণে বেগম রোকেয়ার সাধনা- এসব বিষয়ের ওপর রচিত বই, যা তাঁর মেধা ও মনজগকে গঠন করেছে

কুড়িগ্রামে মেয়েদের স্কুল ছিল না বলে ছেলেদের স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে জাহানার নাম লেখানো হয়১৯৪১ সালে কুড়িগ্রাম থেকে বদলি হয়ে তাঁরা চলে এলেন লালমনিরহাটেলালমনিরহাটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার জন্য সেন্টার ছিলো নাতাই জাহানারা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলেন রংপুর থেকেদ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করলেন জাহানারা ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাসের স্বীকৃতি পানভর্তি হলেন রংপুর কারমাইকেল কলেজেএই কলেজ থেকে আইএ পাস করে ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজেএই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে বিএ পাসের স্বীকৃতি পানএরপর বিএড-এ টিচার্স ট্রেনিং কলেজে১৯৬০ সালে প্রথম শ্রেণীতে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন১৯৬৪ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশীপ পেয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানডিয়াগো স্টেট কলেজ থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেনযুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাস করেন

শিক্ষকতার মাধ্যমে জাহানারা ইমামের কর্মজীবন শুরু হয়সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে ১৯৪৮-৪৯ পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী গার্লস হাই স্কুলে ছিলেনবিয়ের পর ঢাকায় এসে ১৯৫২ সালে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যুক্ত হনএখানে তিনি ১৯৬০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেনএরপর তিনি বুলবুল একাডেমির কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী সহ আরও দুইটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন১৯৬৪ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশীপ পেয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা যানসেখান থেকে ফিরে ১৯৬৬-৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন

এসময় তিনি নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হনতিনি বাংলা একাডেমীর কার্যনির্বাহী পরিষদে জুলাই ১৯৮০-৮২ সাল পর্যন্ত সদস্য ছিলেনতিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউটে খণ্ডকালীন চাকরি করেছেন১৯৬০ সালে তিনি এডুকেশনাল বোর্ডের প্রতিনিধি হয়ে সিলেবাস সেমিনারে পশ্চিম পাকিস্তানের পেশোয়ারায় যানতিনি গার্লস গাইড’, ‘পাকিস্তান উইমেন্স ন্যাশনাল গার্ড’, ‘খেলাধুলা’, ‘অল পাকিস্তান উইমেন্স এসোসিয়েশনসাথে জড়িত ছিলেনতিনি ঢাকা বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও পরিচালনা করেছেনতিনি ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি মঞ্চেশেক্সপিয়ারের একটি নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন

 

১৯৪৮ সালের ৯ আগস্ট শরীফুল আলম ইমাম আহমদের সঙ্গে জাহানারা বেগমের বিয়ে হয়শরীফ ইমাম ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার১৯৫১ সালের ২৯ তাঁদের পরিবারে জন্ম হয় শাফী ইমাম রুমীরএই রুমীই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন দুঃসাহসী গেরিলার ভূমিকায় ছিলেনএক পর্যায়ে তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যানজানোয়ার বাহিনী রুমীকে নির্মমভাবে অত্যচার করে হত্যা করেস্বাধীনতার পর শহীদ রুমী বীরবিক্রম (মরণোত্তর) উপাধিতে ভূষিত হনপ্রাণপ্রিয় সন্তান রুমীকে ঘিরেই জাহানারা ইমাম রচনা করেন অমর গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি১৯৫৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তাদের দ্বিতীয় সন্তান সাইফ ইমাম জামীর জন্ম হয়তাঁর স্বামী শরীফুল আলম ইমাম ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর মারা যায়

কলেজে জাহানারা ইমামের সহপাঠী অঞ্জলিএই অঞ্জলির কাছে কমিউনিজমের পাঠ নেন তিনিতাঁর বাবা মেয়ের হাতে কমিউনিস্টদের পত্রিকা জনযুদ্ধদেখে ক্ষিপ্ত হয়েছিলেনমেয়ে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকুক এটা তাঁর বাবা চাননিস্বামী শরীফও চাননিতাই রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনিকিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কেড়ে নিলো তাঁর বুকের মানিক রুমীকেপ্রিয়তম স্বামী শরীফকেপুত্র এবং স্বামী হারানোর কষ্টকে বুকে ধারণ করে বেঁচে ছিলেন তিনি১৯৮২ সালে তিনি আক্রান্ত হলেন ক্যান্সারেপ্রতি বছর একবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে চিকিসা নিতে হতো তাঁকেএভাবেই কাটছিল তাঁর দিন

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের লোভ ও অদূরদর্শিতার কারণে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র একাত্তরের ঘাতক দালাল রাজাকার আলবদরদের ক্রমশঃ উত্থান তাঁকে বিচলিত করে তুলেছিলোএই ধর্মান্ধ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থানকে রুখে দিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালেন জাহানারা ইমাম১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারী ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিগঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বেএরপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটিগঠনে তিনিই মূল ভূমিকা রাখেনআহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমামদেশের লাখ লাখ মানুষ শামিল হয় নতুন এই প্লাটফর্মে

এই কমিটি ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ গণআদালত’-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠিত করেগণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেনসমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষের পক্ষ থেকে জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানএই গণআদালতের সদস্য ছিলেন_এডভোকেট গাজিউল হক, ড.আহমদ শরীফ, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, বেগম সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, লেঃ কর্নেল (অবঃ) কাজী নূরুউজ্জামান, লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী এবং ব্যারিষ্টার শওকত আলী খানসেদিন পুলিশ ও বিডিআরের কঠিন ব্যারিকেড ভেঙ্গে বিশাল জনস্রোত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকে পড়েছিলোসেই বিশৃঙ্খল পরিবেশে বর্ষীয়ান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ও কথাশিল্পী শওকত ওসমানকে গণআদালত মঞ্চে (ট্রাকে) উপস্থিত করা সম্ভব হয়নি বলে মাওলানা আবদুল আউয়ালকে তাক্ষণিক সিদ্ধান্তে গণআদালত সদস্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়

গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার পর সরকার ২৪জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অজামিনযোগ্য মামলা দায়ের করেপরবর্তীতে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেনতারপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে জাহানারা ইমাম ১২এপ্রিল ১৯৯২ গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবী সংবলিত স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পেশ করেনচিন্তায় চেতনায় মননে ও মেধায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালনকারী ১০০ জন সাংসদ গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করলে আন্দোলনে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার ৩০ জুন ১৯৯২ সংসদে ৪ দফা চুক্তি করতে বাধ্য হয়তবে এ চুক্তি কার্যকর হয়নি আজও

২৮ মার্চ ১৯৯৩ নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমামতিনি প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান রাজপথেএ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলনপত্রপত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমামগোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্টআন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে

২৬ মার্চ ১৯৯৩ স্বাধীনতা দিসবে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশিনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেনগণতদন্ত কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেন_ শওকত ওসমান, কে এম সোবহান, সালাহউদ্দিন ইউসুফ, অনুপম সেন, দেবেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, শাফিক আহমেদ, আবদুল খালেক এবং সদরুদ্দিনএই সমাবেশে আরো ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্ত অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়

এ সময় খুব দ্রুত তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকেলে ১৯৯৪ সালের ২ এপ্রিল চিকিসার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্রয়েট হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়ানা দেন১৯৯৪ সালের ২৬ জুন তিনি মারা যান

তিনিএকাত্তরের দিনগুলিরচনা করে পৌঁছে যান পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষেতাঁর রচনার ও অনুবাদের মধ্যে রয়েছে- অনুবাদ_তেপান্তরের ছোট্ট শহর, নদীর তীরে ফুলের মেলা, সাতটি তারার ঝিকিমিকি, নগরী, ডালাস, অব ব্লাড এন্ড ফায়ার

উপন্যাস ও অন্যান্য_গজকচ্ছপ, ভেতর আগুন, নাটকের অবসানে, দুই মেরু, নিঃসঙ্গ পাইন, নয় এ মধুর খেলা, মূল ধারায় চলেছি

স্মৃতিকথা_অন্য জীবন,একাত্তরের দিনগুলি, প্রবাসের দিনলিপি

জীবনী গ্রন্থ_বীরশ্রেষ্ঠ

ছোটগল্প¬_জীবন মৃত্যু,একাত্তরের দিনগুলি-র কিশোর সংস্করণ বিদায় দে মা ঘুরে আসি, চিরায়ত সাহিত

আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ _ক্যান্সারের সাথে বসবাস

 

 

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.