ভাষা আন্দোলনের জন্মকথা

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনের প্রথম দিনে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটির ওপর দুটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়উত্থাপিত প্রস্তাব নিয়ে গণপরিষদে তুমুল তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এই প্রস্তাবটি ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এর উদ্দেশ্যএই প্রস্তাবের আরো বিরোধিতা করেন পূর্ব-বাংলার গণপরিষদের মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনতিনি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীর মনোভাব হচ্ছে একমাত্র উর্দূকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে 

২৫ ফেব্রুয়ারির আলোচনা শেষে গণপরিষদের মুসলিম লীগের বাঙালি সদস্যরা বাংলাকে পরিষদের রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে ভোট দেয়সেই খবরে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ধর্মঘট পালন হয়২ মার্চ ঢাকা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক সভা গঠিত হ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদপরিষদের ডাকে ১১ মার্চ হরতাল পালন হ১১ মার্চে ছাত্র জনতার উপর প্রশাসনিক গুন্ডা বাহিনীর নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদের ১২ মার্চ বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ এবং ১৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন হয়১৪ মার্চ সারা পূর্বপাকিস্তানে ধর্মঘট পালন হয়ঢাকার বাইরে সারা দেশে ভাষা আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছাত্র ফেডারেশন, মুসলিম ছাত্রলীগ, ছাত্র এসোসিয়েশন, ছাত্র সংঘ, যুবলীগ প্রভৃতি সংগঠনের উদ্যোগে জেলায় জেলায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে নাজিম উদ্দীন ৮ দফা চুক্তিনামাস্বাক্ষর করেন

১৬ মার্চ ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় পুলিশী হামলার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়

১৯ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহ ঘোষণা করেলেন-পাকিস্তানের রাষ্টভাষা হবে উর্দু, অন্যকোনো ভাষা নয় এ ব্যাপারে কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তাহলে বুঝতে হবে সে হচ্ছে রাষ্ট্রের শত্রু

এরপর ২৪ মার্চ সকালে জিন্নাহর সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ সমাবর্তনে জিন্নাহ যখন আবার বলেন উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”; তখন মিলনায়তনে উপস্থিত বেশ কিছু ছাত্র একসঙ্গে না, না বলে উঠেএই দিনে সন্ধ্যায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি দলের সাথে জিন্নাহর সাথে বৈঠক করে। বৈঠকে সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিরো জিন্নাকে অপমান করে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু হলেও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৪৯ সালে১৯৪৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের এক সভায় বলেন সহজ ও দ্রুত যে হরফের মারফত ভাষা পড়া যায় সেই হরফই সবচাইতে ভাল……সুতরাং দ্রুত লিখন ও পঠনের পক্ষে সুবিধাজনক বলিয়া আরবীকেই পাকিস্তানের হরফ করা উচিত

১৯৪৯ সালের ১২ মার্চ পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপনা পরিষদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় অধিবেশন চলাকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল সংসদ ভবন অভিমুখে যাত্রা করেরাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘আরবী হরফ চাই নাইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত ছাত্র মিছিলটির উপরে পুলিশ হামলা চালায় এবং কয়েকজন ছাত্রনেতা গ্র্রেপ্তার করে।  

১৯৫০ সালের ১১ মার্চ দলমত নির্বিশেষে রাষ্ট্রভাষা বাংলা সমর্থক প্রতিটি সংগঠন থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়এই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫১ সালে জুড়ে ঢাকার বাইরে সারা দেশে ভাষা আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে দেয়। যার কারণে ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এই আন্দোলন ছাত্র আন্দোলন থেকে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৫২ সালে ২৭ জানুয়ারী পল্টনে নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের এক জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, পাকিস্তানের একমাত্ররাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ৩০ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ধর্মঘট করে। ৩১ জানুয়ারী বিকেলে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সমাবেশে সর্বসম্মতভাবে গঠিত হয় সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালিত হয়। ঐদিন প্রায় ৪ হাজার ছাত্রছাত্রীর একটি দীর্ঘ বিক্ষোভ মিছিল ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করে ২১ ফেব্রুয়ারী সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট পালনের ঘোষনা দিয়ে শেষ হয় মিছিল পরবর্তী জনসভা ২১ ফেব্রুয়ারী সারাদেশে সাধারণ ধর্মঘট পালনের জন্য ১১ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারী পতাকা দিবস পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়

১১ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারী পতাকা দিবস পালনের মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইলেখা পতাকা বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করা হয়এই টাকার একাংশ টাকা দিয়ে আমাদের ভাষার লাড়াই(বদরুদ্দিন উমর) এবং রাষ্ট্রভাষা কি এবং কেন? (আনিসুজ্জামা) পুস্তিকা দুটি বের করা হয় ২১ ফেব্রুয়ারী হরতালের প্রস্তুতি চলতে থাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথেআর সরকার ২০ তারিখ সন্ধ্যা একমাসের জন্য ঢাকায় সকল প্রকার সভা, সমাবেশ, মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবিতে ঢাকা রাজপথ উত্তালএ আন্দোলন ছড়িয়ে গেছে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস আদালতে, হাটে বাজারে এবং গ্রাম গঞ্জের সবখানে

৫২সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা দেশে আন্দোলনের প্রস্তুতি দিবসওই দিন সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিমনেসিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত) গেটের পাশে ছাত্র-ছাত্রীদের জমায়েত শুরু হতে থাকেসকাল ১১ টায় কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখের উপস্থিতিতে ছাত্র সমাবেশ শুরু হয়

২০ ফেব্রুয়ারী পাকিস্থান সরকার ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিকে তছনছ করে দেয়ার জন্য ঢাকাতে সমাবেশ, মিছিল-মিটিংযের উপর ১৪৪ ধারা জারি করে২১ ফেব্রুয়ারী সকালে দিকে ১৪৪ ধারা ভংগের ব্যাপারে ছাত্র-রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. এস এম হোসেইন এর নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক সমাবেশ স্থলে যান এবং ১৪৪ ধারা ভংগ না করার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করেন

বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সময় ধরে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আব্দুল মতিন এবং গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভংগের পক্ষে মত দিলেও সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হনএ অবস্থায় বাংলার দামাল ছেলেরা দমনমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়উপস্থিত সাধারণ ছাত্ররা স্বত:স্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভংগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) দিকে যাবার উদ্যোগ নেয়অধিকার আদায়ের দাবিতে শত শত বিদ্রোহী কন্ঠে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইএই দাবীতে আন্দোলোন তীব্র হয়ে উঠেপুলিশের সঙ্গে ছাত্র জনতার সংঘর্ষ হয়শ্লোগানে শ্লোগানে কেঁপে উঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামপাসপুলিশ লাঠিচার্জ এবং গুলি বর্ষণ শুরু করেগুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত, রফিক উদ্দীন, শফিউর রহমান এবং আব্দুল জব্বার নামের চার তরুণ শহীদ হনরফিক, জাব্বার, বরকত, শফিক সহ নাম না জানা আরও অনেকের সাথে সালামও সেদিন গুলিবিদ্ধ হন

ভাষাশহীদ

আবুল বরকত

আবুল বরকত একজন ভাষা শহীদরাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইএই দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছেনভাষা সৈনিক আবুল বরকতের জন্ম ১৯২৭ সালের ১৩ জুনভারতের পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহাকুমার ভরতপুর থানার বাবলা নামক একটি ছোট গ্রামেআবুল বরকতের ডাক নাম ছিল আবাইবাবা শামসুজ্জোহামা হাসিনা বিবি

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারেপ্রাথমিক পড়াশুনা শেষে তিনি পার্শ্ববর্তী গ্রাম তালিবপুর ইংলিশ হাই স্কুলে ভর্তি হনওই স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে মেট্রিক পাশ করেনমেট্রিক পাশ করার পর তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি হনএই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন১৯৪৮ সালে তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেনঢাকার পুরানা পল্টনে বিষ্ণু প্রিয়া ভবনে তার মামা আব্দুল মালেক সাহেবের এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেনওই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন১৯৫১ সালে তিনি অনার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেনীতে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন এবং এম.এ. শেষ পর্বে ভর্তি হন

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষের এক সময়ে পুলিশের গুলিতে আবুল বরকত মাটিতে পড়ে যানপ্রথমে কেউ বুঝে উঠতে পারেনি, ততক্ষণে রক্তধারা ছুটে মাটি ভিজে যাচ্ছেতলপেটে গুলি লেগেছিল তার পরনের নীল হাফ শার্ট, খাকি প্যান্ট ও কাবুলী স্যান্ডেল রক্তে ভিজে যাচ্ছেদু'তিন জন ছুটে এসে সুঠামদেহী বরকতকে কাঁধে তুলে জরুরী বিভাগের দিকে দৌড়াতে থাকেনবরকত বলেছিলেন: খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি বাঁচবনা, বিষ্ণু প্রিয়া ভবন পুরানা পল্টনে খবর পৌঁছে দিবেনডাক্তাররা তাকে বাঁচানো জন্য আপ্রা চেষ্টা করেছিলেনকিন্তু, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হযরাত ৮টার সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী ওয়ার্ডে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন

শফিউর রহমান

শহীদ শফিউর রহমান একজন ভাষা শহীদরাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইএই দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছেনমাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে পৃথিবীতে যে সকল আন্দোলন এ যাবতকালে সংগঠিত হয়েছে, তার মধ্যে বাঙ্গালীর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলন শ্রেষ্টতমযার কারণে ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়

ভাষা সৈনিক শফিউর রহমানের জন্ম ১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারীশফিউর রহমান বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোন্নগরেবাবা মাহবুবুর রহমানতিনি ছিলেন ঢাকার পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফ অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারেপ্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশুনা শেষ করে কলকাতার গভর্ণমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজে ভর্তি হনওই কলেজ হতে তিনি আই.কম. পাস করেনআই.কম. পাসের পর শফিউর রহমান চব্বিশ পরগনা সিভিল সাপ্লাই অফিসে কেরানীর চাকরি শুরু করেন

১৯৪৫ সালের ২৮ মে শফিউর রহমান কলকাতার তমিজউদ্দিনের কন্যা আকিলা খাতুনকে বিবাহ করেনআকিলা খাতুনের বয়স তখন ১২ বছর

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তার পিতা মাহবুবুর রহমান পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকা আসেনতিনি ঢাকাতে পাকিস্তান পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ অফিসে সুপারিনটেনডেন্ট পদে চাকুরি নেনশফিউর রহমান ও তাঁর পিতার সঙ্গে ঢাকা আসেনঢাকায় এসে তিনি বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হনপড়াশুনার পাশাপাশি তিনি ঢাকা হাইকোর্টে হিসাবরক্ষণ শাখায় কেরানী পদে চাকুরী শুরু করেনশফিউর রহমানের পাঁচ ভাই ছিলআজাদুর রহমান নামে তাঁর এক ভাই সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি করতেন

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী পর ফেব্রুয়ারী সারাদেশের সত:স্ফূর্তভাবে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসেন এবংরাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইএই দাবিতে রাজপথ অবরোধ করে রাখেন। ওই দিন শফিউর রহমান সকাল দশটায় অফিসে রওনা হনসেদিন পাজামা, শার্ট, গেঞ্জি এবং কোট পরেছিলেনপায়ে ছিল জুতাসাইকেলে তিনি অফিসে যাতায়াত করতেনসকাল সাড়ে দশটার দিকে নবাবপুর রোডে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে বিক্ষোভরত জনতার উপর পুলিশ বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করেশফিউর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতরভাবে আহত হনতাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়কিন্তু অস্ত্রোপচার সফল হয়নিওই দিন সন্ধা সাতটায় হাসপাতালে তিনি মারা যান

শফিউর রহমানের এক মেয়ে এবং এক ছেলের বাবা ছিলেনমেয়ে শাহনাজের বয়স তখন মাত্র তিন বছরমেয়েকে তিনি অত্যন- স্নেহ করতেনগুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় তিনি মেয়ের কথা স্মরণ করেনআহত অবস্থায় তাঁর ডাক্তার ভাইকে তিনি বলেন, 'আমার মেয়েকে দেখোআমি বুঝতে পারছি আমি তার কাছে আর ফিরে যেতে পারব না'ছেলে শফিকুর রহমান তখন মায়ের পেটে১৯৫২ সালের মে মাসে সে জন্ম গ্রহণ করে

গৌরদীপ্ত ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদ শফিউর রহমানকে বাংলাদেশ সরকার মরণোত্তর একুশে পদক (২০০০) প্রদান করেনশহীদ শফিউর রহমানকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়

রফিক উদ্দিন

রফিক উদ্দিন অন্যতম ভাষা শহীদ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইএই দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছেনমাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে পৃথিবীতে যে সকল আন্দোলন এ যাবতকালে সংগঠিত হয়েছে, তার মধ্যে বাঙ্গালীর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলন শ্রেষ্টতমযার কারণে ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়

রফিক উদ্দিন আহমেদের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবরমানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল বলধারা গ্রামেবাবা আবদুল লতিফমা রাফিজা খাতুন

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারেশৈশবে প্রাথমিক পড়ালেখা শুরু কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউটেপড়াশুনা তারপর ১৯৪৯ সালে মানিকগঞ্জের বায়রা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হনওই স্কুল থেকে তিনি ১৯৪৯ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেনম্যাট্রিক পাশ করার পর রফিক উদ্দিন মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্রনাথ কলেজে বানিজ্য বিভাগে ভর্তি হনআই.কম. ক্লাস পর্যন্ত পড়লেও পরে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়ঢাকায় এসে পিতার সঙ্গে প্রেস পরিচালনা করতে শুরু করেনপরে আবার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হনএই কলেজে পড়ার সময়ে তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন

রফিকউদ্দিনের পিতা আবদুল লতিফ ছিলেন ব্যাবসায়ীতিনি কলকাতায় ব্যাসা করতেনরফিকউদ্দিনের ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রফিকউদ্দিনের পিতা ঢাকায় চলে আসেনএখানে বাবুবাজারে আকমল খাঁ রোডে পারিল প্রিন্টং প্রেস নামে ছাপাখানা চালু করেন

২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভ প্রদর্শনরত ছাত্র-জনতার মিছিলে রফিক অংশগ্রহন করেনঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হোস্টেল প্রাঙ্গনে পুলিশ গুলি চালালে সেই গুলি রফিকউদ্দিনের মাথায় লাগেগুলিতে মাথার খুলি উড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়মেডিকেল হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের পূর্বদিকে তার লাশ পড়ে ছিলছয় সাত জন ধরাধরি করে তার লাশ এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় এনে রাখেন

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রফিকই প্রথম গুলিবিদ্ধ হনতাই বলা যায় তিনিই ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদরফিক সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায় বিশেষভাবে উৎসাহী ছিলেনকলকাতায় থাকাকালে তিনি পারিল-বলধারা যুবক সমিতির কার্যকরী পরিষদের সদস্য ছিলেনতাঁর লাশ দাফন করা হয়েছিল আজিমপুর গোরস্থানে

আবদুল জব্বার

শহীদ আবদুল জব্বার একজন ভাষা শহীদরাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইএই দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছেনমাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে পৃথিবীতে যে সকল আন্দোলন এ যাবতকালে সংগঠিত হয়েছে, তার মধ্যে বাঙ্গালীর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলন শ্রেষ্টতমযার কারণে ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়

ভাষা সৈনিক আবদুল জব্বারের জন্ম ১৩২৬ বাংলা, ২৬ আশ্বিনময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার পাঁচাইর গ্রামেবাবা আবদুল কাদের

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারেতারপর তিনি গ্রাম্য পাঠশালায় প্রাথমিক পড়াশুনা শুরু করেনপাঠশালায় কিছুদিন পড়াশুনা করার পর আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে তিনি বাধ্য হয়ে লেখাপড়া বন্ধ করে দেনযুক্ত হন কৃষিকাজেপিতাকে সার্বক্ষণিক কৃষিকাজে সাহায্য করেনতখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১০বছর

আবদুল জব্বার ১৫ বছর বয়সের সময় একদা পরিবারের সাথে রাগ করে জীবন সংগ্রামের অজানা পথে বেরিয়ে আসেনএই অসঙ্গতিপূর্ণ সমাজের কারণে তিনি অনেক কষ্ট, ক্ষুধা, যন্ত্রণা নিয়ে অবশেষে নারায়ণগঞ্জে এসে জাহাজ ঘাটে কাজে যুক্ত হনবছরখানেক পর তিনি  এক ইংরেজ সাহেবের সান্নিধ্যে আসেনসাহেব তাকে একটি চাকরি দিয়ে বার্মায় পাঠানসেখানে আবদুল জব্বার দশ-বারো বছর অবস্থান করে দেশে ফিরে আসেনআবদুল জব্বার দেশে ফিরে আমেনা খাতুন নামে এক যুবতীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হনআমেনা-জব্বার দম্পতি এক পুত্র সন্তান জন্ম দেন

আবদুল জব্বার-আমেনা খাতুন পরিবারে ১৯৫১ সালের শেষের দিকে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়জন্মের ৪ মাস পরে আবদুল জব্বারের শাশুড়ি ক্যান্সারে আক্রান্ত হনশাশুড়িকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ১৯৫২ সালের ২০ শে ফেব্রুয়ারী তিনি ঢাকা আসেন

শাশুড়িকে হাসপাতালে ভর্তি করে আবদুল জব্বার মেডিকেলের ছাত্রদের আবাসস্থল (ছাত্র ব্যারাক) গফরগাঁও নিবাসী হুরমত আলীর রুমে (২০/৮) উঠেন২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনরত ছাত্রদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে, কি হয়েছে দেখবার জন্য তিনি রুম থেকে বের হয়ে আসেনঠিক তিনি যখন ছাত্রদের কাছে গিয়ে দাড়ালেন তখনই পুলিশ গুলি শুরু করেজব্বার গুলিবিদ্ব হনছাত্ররা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জব্বারকে মৃত ঘোষণা করে

আবদুস সালাম

আবদুস সালাম একজন ভাষা সৈনিকরাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইএই দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছেনভাষা শহীদ আবদুস সালামের জন্ম ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বরফেনী জেলার (শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে) দাগনভুঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের লক্ষণপুর গ্রামেবাবা ফাজিল মিয়ামা দৌলতের নেছা৪ ভাই ৩ বোনের মধ্যে সালাম সবার বড়

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারেপ্রাথমিক পড়াশুনা শেষে তিনি মাতুভূঞা করিম উল্যাহ স্কুলে ভর্তি হনওই স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণী পাশ করে দাগনভুঞার কামাল আতাতুর্ক হাই স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হননবম শ্রেণীতে পড়ালেখা চলাকালীন সময় জেঠাতো ভাই হাবিবের সহযোগীতায় সালাম পরিবার স্বচ্চলতার লাভের স্বপ্নে ঢাকায় আসেনঢাকায় এসে ৫৮, দিলকুশা, মতিঝিল ডাইরেক্টর অব ইন্ডাষ্ট্রিজ কমার্স এ পিয়নের চাকুরীতে যোগদান করেনবাস করতেন নীলক্ষেত ব্যারাকে

২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভ প্রদর্শনরত ছাত্র-জনতার মিছিলে রফিক, জাব্বার, বরকত, শফিক সহ নাম না জানা আরও অনেকের সাথে সালামও সেদিন গুলিবিদ্ধ হনগুলিবিদ্ধ সালামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়সে দিনই সন্ধ্যায় টেলিগ্রামে সালামের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে সালামের বাবা ফাজিল মিয়া, জেঠাতো ভাই হাবিব উল্যাহ ও প্রতিবেশী মকবুর আহমদ ২২ ফেব্রুয়ারী সকালে ঢাকায় ছুটে আসেনপ্রায় দেড় মাস ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে ওই বছরের এপ্রিল তিনি মারা যান (সূত্র : ৮ এপ্রিল, দৈনিক আজাদ)

শহীদ সালামের চাকুরী স্থলে তার ছোট ভাই আবদুস সোবহান স্থলাভিষিক্ত হনস্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি শিল্প দপ্তরে রূপান্তরিত হয়সালামের রক্ত মাখা শার্ট সহ আরো কিছু স্মৃতি সাবলিত ট্রাংকটি স্বাধীনতার কয়েক বছর পর সিধেঁল চোর নিয়ে যায়সালামের শেষ স্মৃতি দু খানা ছবি ছিল তা ফেনীর আওয়ামী লীগ নেতা খাজা আহমদকে প্রয়োজনে দেয়া হয়তার মৃত্যুর পর সে ছবির খোঁজ করে পাওয়া যায়নি

১৯৯৯ সালের ১৮ নভেম্বর ফেনী জেলা পরিষদের অর্থায়নে ফেনী শহরের মিজান রোডে অবস্থিত কমিউনিটি সেন্টার ভাষা শহীদ সালামের নামে নামকরণ করা হয়

২০০০ সালে ফেনী জেলার একমাত্র স্টেডিয়াম ভাষা শহীদ সালামের নামে নামকরণ হয়শহীদ সালামের জন্মস্থান লক্ষ্মপুর গ্রামের নাম পরিবর্তন করে সরকারী ভাবে সালাম নগর হিসেবে স্বীকৃতি পায় ২০০০ সালে সরকার শহীদ আবদুস সালামকে মরনোত্তর 'একুশে পদক' প্রদান করেন

২০০৭ সালে ২১ ফেব্রুয়ারী দাগনভুঞা উপজেলা মিলনায়তন 'ভাষা শহীদ সালাম মিলনায়তন' নামে নামকরণ করা হয় এছাড়া ভাষা শহীদ আবদুস সালামের স্মৃতি রক্ষায় সালাম নগর গ্রামে ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ২৫৮ টাকা ব্যয়ে একটি স্মৃতি গ্রন্থাগার ও জাদুঘর নির্মান কাজ শেষ হয়েছে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.