গাজীউল হক: অন্যতম ভাষাসৈনিক

গাজীউল হকের পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। তারপর একটি মক্তবে তাঁর পড়াশুনা শুরু হয় মক্তবের পড়াশুনা শেষ করে তিনি কাশিপুর স্কুলে ভর্তি হন এই স্কুল থেকে তিনি উচ্চ প্রাইমারি বৃত্তি লাভ করেন১৯৪১ সালে তিনি বগুড়া জেলা স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন এই স্কুলে পড়ার সময়েই তিনি শিক্ষক সুরেন বাবুর সান্নিধ্যে আসেন তিনিই গাজীউল হকের চেতনায় দেশপ্রেমের বীজ বপন করে দেন।

১৯৪৬ সালে এই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন এরপরই তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজে আইএ ভর্তি হন কলেজে ভর্তি হয়েই তিনি অধ্যক্ষ ভাষা বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সংস্পর্শে আসেন তাঁর সংস্পর্শে এসে গাজীউল হক বাম রাজনীতিতে আসেন।

১৯৪৮ সালে তিনি বগুড়া কলেজ থেকে আইএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে অর্নাস ভর্তি হন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে উঠলেন। এসময় তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে কারাবরণ করেন ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন-বেতন কর্মচারিগণ ধর্মঘট আহবান করলে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে তিনিও এর সমর্থন করেন ১৯৫১ সালে বি এ অর্নাস পাশ করে এমএ ভর্তি হন এবার তিনি ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃত্তি, বির্তক প্রভৃতি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন ১৯৫২ সালে তিনি এমএ পাশ করেনকিন্তু ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তাঁর এমএ ডিগ্রি কেড়ে নেয় পরবতীতে ছাত্রনেতা ইশতিয়াক, মোহাম্মদ সুলতান, জিল্লুর রহমান প্রমুখের প্রচণ্ড আন্দোলনের চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর এমএ ডিগ্রি ফেরত দিতে বাধ্য হয়১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শাস্ত্রে ভর্তি হন ১৯৫৬ সালে তিনি একসঙ্গে ১১ পেপার আইন পরীক্ষা দেন

১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ বগুড়া জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন। ওই বছর কুষ্টিয়ার নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কনফারেন্সে তিনি যোগ দেন

১৯৪৬ সালে তিনি ধুবড়িতে অনুষ্ঠিত আসাম মুসলিম লীগ কনফারেন্সে যোগ দেন৷ এখানে তিনি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ব্যক্তিত্ব, বাগ্মীতা এবং নেতৃত্বে আকৃষ্ট হন ১৯৪৭ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুব লীগের ঈশ্বরদী কনফারেন্সে উত্তরবঙ্গ শাখার যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন ওই বছর ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অসাম্প্রদায়িক যুব প্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক যুবলীগের দুদিনব্যাপী কমী সম্মেলনের আয়োজন করে গাজীউল হক বগুড়ার পাঠচক্র শিল্পায়নের সদস্যদের সঙ্গে অংশ নেন

১৯৪৮ সালে তিনি পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের বগুড়া জিলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত ন। এ সময় থেকেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইয়ের সংগ্রাম শুরু হয়। ১১ মার্চ গাজীউল হক বগুড়া কলেজ থেকে ছাত্রদের মিছিল নিয়ে বগুড়া শহর প্রদক্ষিণ করেন। বগুড়া জেলা স্কুল ময়দানে সেদিনের সভার সভাপতি ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতি হিসেবে বাংলাকে রাষ্ট্র্রভাষা করার দাবির স্বপক্ষে দীর্ঘ সময়ব্যাপী যুক্তি ও তথ্য নির্ভর ভাষণ দেন ১৯৪৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিম্ন কর্মচারীরা ধর্মঘট আহ্বান করে এই আন্দোলনে তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৯ সালের দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় তিনি কাজ করেন। এ সময় মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে একটি ভুখা মিছিল বের হয় এই মিছিলে গাজীউল হকও শরিক হন

১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয় আবদুল মতিনকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন ঢাকায় এসে পল্টনের জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন র্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষ এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্র হলে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করা হয় ঘোষণানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় গাজীউল হকও সেই সভায় অংশ নেন। সভা শেষে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে ফুলার রোড হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য মন্ত্রী নূরুল আমীনের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা ছিল উত্তাল। এ আন্দোলন ছড়িয়ে গিয়েছিল সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস আদালতে রাজপথে সবখানে৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা দেশে আন্দোলনের প্রস্তুতি দিবসওই দিন সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিমনেসিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত) গেটের পাশে ছাত্র-ছাত্রীদের জমায়েত শুরু হতে থাকে। সকাল ১১ টায় কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখের উপস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ শুরু হয়।

২০ ফেব্রুয়ারী পাকিস্থান সরকার ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিকে তছনছ করে দেয়ার জন্য ঢাকাতে সমাবেশ, মিছিল-মিটিংযের উপর ১৪৪ ধারা জারি করে। সকালের দিকে ১৪৪ ধারা ভংগের ব্যাপারে ছাত্র-রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. এস এম হোসেইন এর নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক সমাবেশ স্থলে যান এবং ১৪৪ ধারা ভংগ না করার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করেন।

বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সময় ধরে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আব্দুল মতিন এবং গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভংগের পক্ষে মত দিলেও সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হন। এ অবস্থায় বাংলার দামাল ছেলেরা দমনমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়উপস্থিত সাধারণ ছাত্ররা স্বত:স্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভংগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) দিকে যাবার উদ্যোগ নেয়। অধিকার আদায়ের দাবিতে শত শত বিদ্রোহী কন্ঠে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এই দাবীতে আন্দোলোন তীব্র হয়ে উঠেপুলিশের সঙ্গে ছাত্র জনতার সংঘর্ষ হয় শ্লোগানে শ্লোগানে কেঁপে উঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামপাসবুলেট আর লড়াই শুরু হয় পুলিশ লাঠিচার্জ এবং গুলি বর্ষণ শুরু করে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবি এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর মাষ্টার্সের ছাত্র), রফিক উদ্দীন, এবং আব্দুল জব্বার নামের তিন তরুণ মারা যায়। রফিক, জাব্বার, বরকত, শফিক সহ নাম না জানা আরও অনেকের সাথে সালামও সেদিন গুলিবিদ্ধ হন

১৯৫৩ সালের মে মাসে গাজীউল হক এবং খন্দকার গোলাম মোস্তফাকে গ্রেফতার করা হয় তাঁদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ছাত্ররা ধর্মঘট শুরু করে সৈয়দ ইসতিয়াক আহমদ, কামরুজ্জামান, মোহাম্মদ সুলতান নেতৃত্বে ছাত্ররা তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের বাসভবন ঘেরাও করে অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং পূব-পাকিস্তান সরকার সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে মীমাংসায় আসতে বাধ্য হয়। কারাগার থেকে বেরিয়ে গাজীউল বগুড়া চলে যান

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি অংশ নিয়ে বগুড়ার মুসলিম লীগকে শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত করেন কাগমারী সম্মেলনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠনে আওয়ামী লীগের সর্বাঙ্গীন প্রতিকূলতা প্রতিরোধে ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহকমী হিসেবে কাজ করেন

ওই বছর ২১ ফেব্রুয়ারি পালন বন্ধের জন্য সরকার ধরপাকড় শুরু করে ১৯ ফেব্রুয়ারি গাজীউল হকসহ কয়েকজন নেতাকমীকে বগুড়া থেকে গ্রেফতার করা হয়। এবার প্রায় ২৯মাস কারাগারে তাকে থাকতে হলো

১৯৫৭ সালে আইনজ্ঞ সৈয়দ নওয়াব আলীর অধীনে বগুড়া বারে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ৬২র শিক্ষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে পূব-পাকিস্তান ঢাকা হাই কোর্টে আইন ব্যবসায়ের সনদ লাভ করেন ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে যোগদান দেন। সর্বোচ্চ আদালতে একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।

বগুড়ায় ১৯৬৯ সালের ১১ দফা আন্দোলনের মূল চাবিকাঠি ছিল বিড়ি শ্রমিক ও মজদুরগণ৷ গাজীউল হকও ১১ দফা আন্দোলনে অংশ নেন

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই গাজীউল হক মাত্র ২৭জন যুবকসহ পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন সিদ্ধান্ত মোতাবেক গাজীউল হক, ডা. জাহিদুর রহমান অন্যান্য যুবকদের নিয়ে বগুড়া থানার আঙ্গিনায় জড়ো হন৷ থানার পুলিশ এবং ৩৯জন ইপিআর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন৷ এসময় আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ভাসানী ও কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দদের নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি হাই কমান্ড গঠন করা হয়৷ এই হাই কমান্ডের সদস্য ছিলেন গাজীউল হক

২৭ মার্চ থেক ১এপ্রিল ৬০ জন পুলিশের একটি দল পাকসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ১ এপ্রিল গাজীউল হকের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধরা আড়িয়া ক্যান্টনমেন্টে আক্রমণ চালিয়ে ৬৯জন পাক সেনাকে বন্দি করেনমুক্তিযোদ্ধারা এই ক্যান্টনমেন্ট থেকে ৫৮ ট্রাক গোলাবারুদ উদ্ধার করেন। এভাবে চললে থাকে পাক-বাহিনী প্রতিরোধ। ১৬ এপ্রিল গাজীউল হক অস্ত্র সংগ্রহ এবং অস্থায়ী সরকারের সঙ্গে উত্তরাঞ্চল যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে ভারত যান। ভারত থেকে বগুড়া আসার পথে যখন তিনি জানতে পারেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বগুড়া দখল করেছে, তখন তিনি দ্রুত এ সংবাদ অস্থায়ী সরকারের কাছে রির্পোট করেন হিলিতে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে একটি খণ্ড যুদ্ধে অংশগ্রহণের পর কলকাতায় ফিরে গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র জয়বাংলাপত্রিকার বিক্রয় বিভাগের দায়িত্বসহ আকাশ বাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে রণাঙ্গনের সংবাদ প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়৷ অনেক নিযাতন করার পর ১৯৭৬ সালে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়

গাজীউল হক ২০০৯ সালের ১৭ জুন মৃত্যুবরণ করেন।

 

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.