অলি আহাদ: একজন ভাষা সৈনিক

ভাষা সৈনিক অলি আহাদের জন্ম ১৯২৮ সালেব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সদর উপজেলার ইসলামপুরেতাঁর পিতা আবদুল ওহাবতিনি ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারেপ্রাথমিক পড়াশুনা শেষে ১৯৪৪ সালে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে গণভোটে তিনি ত্রিপুরা জেলার সদস্য বিশিষ্ট ওয়ার্কাস ক্যাম্পের অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনের কারণে ১৯৪৬ সালে আই এস সি পরীক্ষা দিতে পারেন নিএরপর তিনি ১৯৪৭ সালে প্রথম বিভাগে আই এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হনকলেজ জীবনেই তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী হিসাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন

১৯৪৮ সালে জানুয়ারি গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগতিনি সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন১৯৫২ এর রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনে অন্যতম নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের জন্য তাকে প্রথম কারাগারে নিক্ষিপ্ত পাকিস্তান পুলিশ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি. কম পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তত্কালীন কর্তৃপক্ষ তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম কম পড়ার সুযোগ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করে

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা ছিল উত্তাল আন্দোলন ছড়িয়ে গিয়েছিল সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস আদালতে এবং রাজপথের সবখানে৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা দেশে আন্দোলনের প্রস্তুতি দিবসওই দিন সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিমনেসিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত) গেটের পাশে ছাত্র-ছাত্রীদের জমায়েত শুরু হতে থাকেসকাল ১১ টায় কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখের উপস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ শুরু হয়

২০ ফেব্রুয়ারী পাকিস্থান সরকার ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিকে তছনছ করে দেয়ার জন্য ঢাকাতে সমাবেশ, মিছিল-মিটিংযের উপর ১৪৪ ধারা জারি করেসকালের দিকে ১৪৪ ধারা ভংগের ব্যাপারে ছাত্র-রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর . এস এম হোসেইন এর নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক সমাবেশ স্থলে যান এবং ১৪৪ ধারা ভংগ না করার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করেন

বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সময় ধরে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আব্দুল মতি এবং গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভংগের পক্ষে মত দিলেও সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হন অবস্থায় বাংলার দামাল ছেলেরা দমনমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ায়বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ১১৪ ধারা ভঙ্গ করতে বদ্ধপরিকর ছিলসংগ্রাম পরিষদের সভায় আবদুল মতিন, অলি আহাদ গোলাম মওলা ১১৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে ভোট দেনছাত্ররা ১০ জনে অসংখ্য দলে বিভক্ত হয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে ১১৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১১৪ ধারা ভাঙ্গা শুরু করলে ছাত্রদের সাথে পুলিশের খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়উপস্থিত সাধারণ ছাত্ররা স্বত:স্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভংগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) দিকে যাবার উদ্যোগ নেয়অধিকার আদায়ের দাবিতে শত শত বিদ্রোহী কন্ঠে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এই দাবীতে আন্দোলোন তীব্র হয়ে উঠেপুলিশের সঙ্গে ছাত্র জনতার সংঘর্ষ হয়শ্লোগানে শ্লোগানে কেঁপে উঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামপাসবুলেট আর লড়াই শুরু হয়পুলিশ লাঠিচার্জ এবং গুলি বর্ষণ শুরু করেগুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবি এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর মাষ্টার্সের ছাত্র), রফিক উদ্দীন, এবং আব্দুল জব্বার নামের তিন তরুণ মারা যায়রফিক, জাব্বার, বরকত সহ নাম না জানা আরও অনেকের সাথে সালামও সেদিন গুলিবিদ্ধ হন 

২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে অনানুষ্ঠানিক ভাবে শহীদ শফিউর রহমানে পিতা আর ২৬ ফেব্রুয়ারি আবুল কালাম শামসুদ্দিন আনুষ্ঠানিক ভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেছিলেনইতিমধ্যে পুলিশ নিরাপত্তা আইনে আবুল হাশিম, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ, পুলিন দে, অধ্যাপক পৃথ্বিশ চক্রবর্তী, অলি আহাদ প্রমুখকে গ্রেফতার করে

তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকাকালীন সময়ে প্রচার সম্পাদক সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের মধ্য তিনি মাওলানা ভাসানীর সাথে প্রগতিশীলদের পক্ষে যোগ দেনসাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন কালে তিনি স্বৈরাচার বিরোধী জনমত গঠন করেনতাঁর রচিত জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫ নামক গ্রন্হটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল

সাধীনতা যুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনমুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে তিনি আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্হান গ্রহণ করেনমুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা বাস্তবায়নের জন্য শাসকদের উপর তিনি চাপ সৃষ্টি করেনতত্কালীন সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীর নের্তৃত্ব দুঃশাসন বিরোধী এক তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেনসরকার কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারি করে সভা সমিতি বন্ধ করার প্রতিবাদে জানিয়ে জনাব অলি আহাদ ১৯৭৪ সালের ২৮ জুন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন কারণে ১৯৭৪ সালের ৩০ জুন বিশেষ ক্ষমতা আইনে সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে

আশির দশকে সামরিক শাসন ব্যবস্হার বিরুদ্ধে আপোসহীন ভূমিকার কারণেও তাঁকে একাধিকবার গ্রেফতার করে কারাগারে আটকে রাখা হয়এরশাদ সরকার সামরিক ট্রাইবুনালে তাঁর বিচার করেওই সময় জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ইত্তেহাদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়

স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জনাব অলি আহাদকে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০০৪ প্রদান করা হয়

 

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.