জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদঃ অন্যতম ভাষা সৈনিক

 

 

সুফিয়া আহমেদের জন্ম ১৯৩২ সালের ২০ নভেম্বরবাবা মোহাম্মদ ইব্রাহীমতিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  উপাচার্য (১৯৫৬-৫৮) ছিলেনমা লুত্ফুন্নেছা ইব্রাহীম

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারেতারপর ঢাকার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভর্তি হনএই স্কুলে তিনি বেশী দিন  পড়াসশুনা করতে সক্ষম হননিতার মূল কারণ হলো বিচারপতি বাবার সরকারী চাকরিএরপর তিনি ভর্তি হন দার্জিলিং-এর Dow Hill স্কুলেএখানে তাকে বডিংয়ে থাকতে হতমেয়ের সেই বোডিং জীবনে প্রতিদিন চিঠি লিখতেন বাবা১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সুফিয়া আহমেদ চলে আসেন নিজ দেশে১৯৪৮ সালে বিচারপতি বাবার কর্মস্থল ছিল বরিশালএখান থেকে তিনি প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন

১৯৫০ সালে Intermediate of Arts পরীক্ষা দেনএই পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেল সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে তিনি অষ্টম স্থান অধিকার করেনতারপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইংরেজিকে সাবসিডিয়ারি নিয়ে ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হন১৯৫২ সালে তিনি তুরস্কে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের ছাত্রী সদস্য হিসেবে পূর্ব পকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেনস্নাতক ডিগ্রী অর্জন করার পর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৩-৫৪ সালে এম. পড়ার সময় তিনি সান্ধ্যকালীন Law ক্লাসে ভর্তি হনএম. পরীক্ষার অল্প কিছুদিন পরেই ১৯৫৫ সালে Ph.d করতে তিনি স্বামী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ ছোট ভাই খালেদ ইব্রাহীমের সঙ্গে লণ্ডনে চলে যান তাঁর Ph.d- বিষয় ছিল-আধুনিক ভারতের ইতিহাস১৯৬০ সালে তিনি-'Some Aspects of the History of The Muslim Community in Bengal (1884- 1912)' শিরোনামে অভিসন্দর্ভ রচনা করে Ph.d অর্জন করেন

১৯৬১ সালর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাত্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিভাগে যোগদান করেন১৯৮৩ সালে তিনি এই বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন

দেশের বাইরেও সুফিয়া আহমেদ একজন অনন্য শিক্ষা ব্যক্তিত্ব পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের পাশাপাশি অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ বিদেশের মাটিতে অধ্যাপনাও করেছেনতুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অবস্থিত Basphorus University তে তিনি ১৯৮৪-৮৫ সালের জুলাই পর্যন্ত Visiting Professor হিসেবে অধ্যাপনা করেনআবার ১৯৮৫ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের Wisconsin State- অবস্থিত Milwaukee শহরের একটি মহিলা কলেজ - Alverno College এখানেও তিনি Fulbright Visiting Professor হিসেবে অধ্যাপনা করেন

প্রথম নারী যিনি দুবার জাতিসংঘে কোনো দেশের প্রতিনিধিত্ব করেনপ্রথমবার ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের এবং দ্বিতীয়বার ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের হয়েএরপর প্যারিসে ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে ১৯৮৩ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেনসুফিয়া আহমেদ জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা ছাড়াও ১৯৭২-৮৬ সাল পর্যন্ত গার্ল গাইড আন্দোলনের নির্বাচিত আন্তর্জাতিক কমিশনার ছিলেন

 বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চায় নিয়োজিত সংগঠন বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ 'Cheshire Home Foundation'-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যবাংলাদেশ ব্যাংক-এর 'মেম্বার বোর্ড অব ডাইরেক্টর' হিসেবে ২০০৪ থেকে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন

১৯৫২ সালের সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সংখ্যা ছিল বড় জোর ৭০জনএর মধ্যে হলে থাকত ৩০ থেকে ৩৫ জনের মতোCo- education হলেও ছেলেমেয়েদের মধ্যে কথা হতো প্রক্টরের মাধ্যমে অবাধে মেলামেশার কোনও সুযোগ কল্পনায় করা যেত না২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল এই ধারা ভাঙ্গা হবে কিনা নিয়ে ছাত্র নেতাদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিলতবে নিয়ম শৃঙ্খলতার কঠোরতা ভেঙ্গে মুখের ভাষা রক্ষার তাগিদে সেদিনের আন্দোলনে ছাত্রীরাও এসেছিলেন

এখন যেখানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড, সেখানেই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন আর এই কলা ভবনের সামনে আমগাছের গোড়াতে ছিল সদা হাস্যময় মধুদার দোকানসেদিন এখানেই জমেছিল ছাত্র জনতার ভিড়সবাই স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের মায়ের ভাষাকে আপনার করে রাখার সংগ্রামে হাজির হয়েছিলবেলা ১১ কি ১২ টার দিকে মিটিং শুরু হলে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা হবে কি-না নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলছিলভাষা আন্দোলনের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের সাথে স্কুল কলেজের ছাত্রীরাও মিটিং, মিছিল করেছে সক্রিয় ভাবে২১ তারিখেও এর ব্যতিক্রম হয়নিমিটিং- সিদ্ধান্ত হয় যেহেতু বাইরে ১৪৪ ধারা তাই ছেলেরা ১০ জন এবং মেয়েরা জন করে ভাগে ভাগে বের হবে১৪৪ ধারা ভাঙ্গার এই সিদ্ধান্ত বুঝতে পারে পুলিশগেটের সামনেই পুলিশ লাঠি নিয়ে কর্ডন করে পুলিশের তত্পরতার মুখে সিদ্ধান্ত হয় গ্রেফতার এড়াতে মেয়েরা আগে রাস্তায় নামবেপ্রথম ব্যাচেই শফিয়া আপা, রওশন আরা, শামসুন নাহার আর ডেন কলেজের একটি মেয়ে যার নাম এখন আর মনে নেইসবাই মিলে রাস্তায় নেমে আসিআমাদের উদ্দেশ্য ছিল ইস্ট বেঙ্গল এসেমব্লি হল (এখন যেটা জগন্নাথ হল) . শফিয়া খাতুন পুলিশের লাঠির ওপর দিয়ে লাফ দিয়ে কর্ডন পার হয়ে যায়. হালিমা কয়েকজন স্কুলের মেয়ে নিয়ে পুলিশের বন্দুকের নল সরিয়ে তার নিচ দিয়ে বের হয়ে যায় রাস্তায়পুলিশ বেশ কিছু ছেলে-মেয়েকে ভ্যানে উঠিয়ে নিয়ে যায় অবশ্য পরে টঙ্গির কাছে ছেড়ে দেয়এই ঘটনার পরপরই ছাত্রজনতা ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশের ওপরমিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ শুরু করেসেদিনের গুলিতে গড়িয়ে পড়ে আজকের নাম জানা ভাষা শহীদ বরকত, শফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকেএতে আমিসহ আরও অনেকেই আহত হয়তার উপরে টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজ তো আছেইসে এক ভয়ংকর অবস্থালাঠিচার্জ আর গ্যাসের যন্ত্রনা থেকে বাঁচতে আমরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে শুরু করলাম-- সুফিয়া আহমেদ

ঐতিহাসিক মহান ভাষা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কৃতির বিকাশে সুফিয়া আহমেদের অবদানের সর্ব্বোচ্চ স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেছে ২০০২ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-এর সদস্যরূপে মনোনীত করেনশিক্ষা সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি জানিয়ে Zonta International Club তাকে ২০০৫ সালের ১৬ জুন Life time Achievement Award প্রদান করে১৯৯৫ সালে . সুফিয়া আহমেদকে জানানো হয় বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপকের সম্মান

 

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.