শিকড় সন্ধানী শিল্পী : অদ্বৈত মল্ল বর্মণ_প্রফেসর মোহাম্মদ আশরাফ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তিতাস নদীর পাড়ে গোর্কণ নামক একটি জেলে পাড়ায় ১৯১৪ সালের পহেলা জানুয়ারি এক মালো পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেনার বাবার নাম অধরচন্দ্র বর্মণতিন ভাইবোনের মধ্যে অদ্বৈত ছিলেন দ্বিতীয় সন্তাঅস্বচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় এবং অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারানোর ফলে তাকে অত্যন্ত দুঃ-কষ্ট দারিদ্যের মাঝে দিন কাটাতে হয়তার নিজের পরিবারের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করার মতো সামর্থ না থাকায় গ্রামের লোকদের অর্থ সহায়তায় তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়গ্রামের দশটা বালকের মতো অদ্বৈতকেও পাঁচ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে এসে লেখাপড়া করতে হত

১৯৩৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে মেট্রিক পরীক্ষা পাশ করেনতারপর উচ্চ শিক্ষা আশায় তিনি কুমিলস্না শহরে এসে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেছে আই. ক্লাসে ভর্তি হনকিন্তু অর্থের অভাবে মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও বেশি দূর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি সময় তিনি লজিং থেকে, ছাত্র পড়িয়ে লেখাপড়ার খরচ চালাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হনতাই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এক সময় তিনি জীবিকার সন্ধানে কলকাতা শহরে পাড়ি জমান

কলকাতায় গিয়ে তিনি প্রথমে সাংবাদিক হিসেবে মাত্রিক ত্রিপুরা নামে পত্রিকায় কাজ শুরু করেনতারপর কুমিল্লা কৃতি সন্তা ক্যাপ্টেন নরেন্দ্র দত্তের নবশক্তি পত্রিকা প্রকাশিত হলে ১৯৩৩ সালে তিন ওই পত্রিকায় সম্পাদকের সহকারী হিসেবে যোগদান করেননবশক্তি পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সম্পাদিত মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় যোগদান করেন এবং তিন বছর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকা প্রকাশিত হলে তাতেও তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেনএছাড়া ওই সময় তিনি নবযুগ, ‘কৃষক এবং যুগান্ত প্রত্রিকাতেও সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

১৯৪৫ সালে কলকতায় সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকা প্রকাশিত হলে তিনি সম্পাদকের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব র্যন্ত ওই পত্রিকাতে কর্মরত ছিলেনওই সময়ে নিজের আয় বাড়ানোর জন্য বিশ্বভারতীর প্রকাশনা বিভাগেও তিনি খণ্ডকালীন কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেনএই ভাবে তিনি কলকাতায় সাংবাদিকতার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন

পেশায় সাংবাদিক হয়েও মূলত তিনি ছিলেন এজন উঁচু দরের সৃজনশীল সাহিত্যিকঅন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় তার সাহিত্য চর্চা শুরু স্কুল জীবনে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখে তিনি অনেক পুরস্কার পদক লাভ করেনস্কুল জীবনে মূলত কবিতা লিখলেও পরবর্তী জীবনে উপন্যাস রচনা করে িনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন

অদ্বৈত মল্ল বর্মণের বিখ্যাত উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম তিতাস পাড়ের মালো সম্প্রদায়ের ণ্ডিত জীবন চিত্র নিয়ে উপন্যাসটি রচিতএতে তাদের জীবিকার পেশা, প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখ, আচার-আচরণ, স্বপ্ন, ভালোবাসা, ধর্মীয় পূঁজা-পার্বণ ইত্যদি বিষয় চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে১৩৫২ বঙ্গাব্দের ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হতে থাকেকিন্তু কয়েক কিস্তি প্রকাশিত হওয়ার পর উপন্যাসের মূল পণ্ডুলিপি লেখক রাস্তা হারিয়ে ফেলেনপরে বন্ধু-বান্ধন আগ্রহী পাঠকদের বিশেষ অনুরোধে তিনি কাহিনীটি ুণরায় লিখেনওই সময়ে যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে পাণ্ডুলিপিটি বন্ধুদের কাছে জমা রেখে যানতার মৃত্যুর এক বছর পর বন্ধুরা পণ্ডুলিপি তিতাস একটি নদীর নাম এই শিরোনামে গ্রন্থাকারে মুদ্রিত এই বিখ্যাত উপন্যাসটি তিনি সচক্ষে দেখে যেতে পারেননিার মৃত্যুর পর শাদা হাওয়া রাঙামাটি নামে আরও দুটি পণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে

অদ্বৈত মল্ল বর্মণ ছিলেন চিরকুমারতার বেশভূষাও ছিল অতি সাধারণসারা জীবন তিনি নিদারু অর্থকষ্টে দিন কাটিয়েছেনজীবনে যা আয় করতেন তা দিয়ে পুরানো বই কিনতেন এবং যা অবশিষ্ট থাকত, তা নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের মাঝে অকাতরে বিলিয়ে দিতেনতিনি সব সময় তার নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের উন্নতির কথা চিন্তা করতেনতাদের উপকার করার চেষ্টা করতেন

হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আসার কিছুদিন পর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েনতখন বন্ধুরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করল তিনি সেখান থেকে পালিয়ে এসে নারকেল ডাঙ্গার ষষ্ঠীতলার বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং ১৯৬১ সালে ১৬ এপ্রিল সেই বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেনঅদ্বৈত মল্ল বর্মণের মৃত্যুর পর তার বন্ধুরা বহুকষ্টে সংগৃহীত তার বইগুলো কলকাতার রামমোহম লাইব্রেরীতে জমা দিয়ে দেন

লেখক : অধ্যক্ষ কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ

 

 

অদ্বৈত মল্ল বর্মণ (১৯১৪-১৯৬১) বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের এক অকাল প্রয়াত শিল্পীবাংলা সাহিত্যে নদীভিত্তিক উপন্যাস রচনা করে যারা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন, অদ্বৈত মল্ল বর্মণ তাদের মধ্যে অন্যতমতিনি খুব বেশি উপন্যাস রচনা করতে না পারলেও একটিমাত্র উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম রচনার জন্যে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবেন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তিতাস নদীর পাড়ে গোর্কণ নামক একটি জেলে পাড়ায় ১৯১৪ সালের পহেলা জানুয়ারি এক মালো পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেনার বাবার নাম অধরচন্দ্র বর্মণতিন ভাইবোনের মধ্যে অদ্বৈত ছিলেন দ্বিতীয় সন্তাঅস্বচ্ছল পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় এবং অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারানোর ফলে তাকে অত্যন্ত দুঃ-কষ্ট দারিদ্যের মাঝে দিন কাটাতে হয়তার নিজের পরিবারের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করার মতো সামর্থ না থাকায় গ্রামের লোকদের অর্থ সহায়তায় তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়গ্রামের দশটা বালকের মতো অদ্বৈতকেও পাঁচ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে এসে লেখাপড়া করতে হত

১৯৩৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে মেট্রিক পরীক্ষা পাশ করেনতারপর উচ্চ শিক্ষা আশায় তিনি কুমিলস্না শহরে এসে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেছে আই. ক্লাসে ভর্তি হনকিন্তু অর্থের অভাবে মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও বেশি দূর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি সময় তিনি লজিং থেকে, ছাত্র পড়িয়ে লেখাপড়ার খরচ চালাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হনতাই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে এক সময় তিনি জীবিকার সন্ধানে কলকাতা শহরে পাড়ি জমান

কলকাতায় গিয়ে তিনি প্রথমে সাংবাদিক হিসেবে মাত্রিক ত্রিপুরা নামে পত্রিকায় কাজ শুরু করেনতারপর কুমিল্লা কৃতি সন্তা ক্যাপ্টেন নরেন্দ্র দত্তের নবশক্তি পত্রিকা প্রকাশিত হলে ১৯৩৩ সালে তিন ওই পত্রিকায় সম্পাদকের সহকারী হিসেবে যোগদান করেননবশক্তি পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সম্পাদিত মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় যোগদান করেন এবং তিন বছর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকা প্রকাশিত হলে তাতেও তিনি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেনএছাড়া ওই সময় তিনি নবযুগ, ‘কৃষক এবং যুগান্ত প্রত্রিকাতেও সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

১৯৪৫ সালে কলকতায় সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকা প্রকাশিত হলে তিনি সম্পাদকের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব র্যন্ত ওই পত্রিকাতে কর্মরত ছিলেনওই সময়ে নিজের আয় বাড়ানোর জন্য বিশ্বভারতীর প্রকাশনা বিভাগেও তিনি খণ্ডকালীন কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেনএই ভাবে তিনি কলকাতায় সাংবাদিকতার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন

পেশায় সাংবাদিক হয়েও মূলত তিনি ছিলেন এজন উঁচু দরের সৃজনশীল সাহিত্যিকঅন্নদা উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় তার সাহিত্য চর্চা শুরু স্কুল জীবনে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখে তিনি অনেক পুরস্কার পদক লাভ করেনস্কুল জীবনে মূলত কবিতা লিখলেও পরবর্তী জীবনে উপন্যাস রচনা করে িনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন

অদ্বৈত মল্ল বর্মণের বিখ্যাত উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম তিতাস পাড়ের মালো সম্প্রদায়ের ণ্ডিত জীবন চিত্র নিয়ে উপন্যাসটি রচিতএতে তাদের জীবিকার পেশা, প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখ, আচার-আচরণ, স্বপ্ন, ভালোবাসা, ধর্মীয় পূঁজা-পার্বণ ইত্যদি বিষয় চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে১৩৫২ বঙ্গাব্দের ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হতে থাকেকিন্তু কয়েক কিস্তি প্রকাশিত হওয়ার পর উপন্যাসের মূল পণ্ডুলিপি লেখক রাস্তা হারিয়ে ফেলেনপরে বন্ধু-বান্ধন আগ্রহী পাঠকদের বিশেষ অনুরোধে তিনি কাহিনীটি ুণরায় লিখেনওই সময়ে যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে পাণ্ডুলিপিটি বন্ধুদের কাছে জমা রেখে যানতার মৃত্যুর এক বছর পর বন্ধুরা পণ্ডুলিপি তিতাস একটি নদীর নাম এই শিরোনামে গ্রন্থাকারে মুদ্রিত এই বিখ্যাত উপন্যাসটি তিনি সচক্ষে দেখে যেতে পারেননিার মৃত্যুর পর শাদা হাওয়া রাঙামাটি নামে আরও দুটি পণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে

অদ্বৈত মল্ল বর্মণ ছিলেন চিরকুমারতার বেশভূষাও ছিল অতি সাধারণসারা জীবন তিনি নিদারু অর্থকষ্টে দিন কাটিয়েছেনজীবনে যা আয় করতেন তা দিয়ে পুরানো বই কিনতেন এবং যা অবশিষ্ট থাকত, তা নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের মাঝে অকাতরে বিলিয়ে দিতেনতিনি সব সময় তার নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের উন্নতির কথা চিন্তা করতেনতাদের উপকার করার চেষ্টা করতেন

হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আসার কিছুদিন পর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েনতখন বন্ধুরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করল তিনি সেখান থেকে পালিয়ে এসে নারকেল ডাঙ্গার ষষ্ঠীতলার বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং ১৯৬১ সালে ১৬ এপ্রিল সেই বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেনঅদ্বৈত মল্ল বর্মণের মৃত্যুর পর তার বন্ধুরা বহুকষ্টে সংগৃহীত তার বইগুলো কলকাতার রামমোহম লাইব্রেরীতে জমা দিয়ে দেন

লেখক : অধ্যক্ষ কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.