ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিমঃ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সেবার এক ঊজ্জ্বল নক্ষত্র

কোনো সৃষ্টিই বিশৃঙ্খল নয়। সব কিছু সুনির্দিষ্ট সময়ে সুশৃঙ্খলভাবে চলছে। মানুষের জীবনের পরিধি সসীম কিন্তু কর্মের পরিধি অসীম। অবশ্যই এই কর্ম খাঁটি হতে হবে, জনকল্যাণমূলক হতে হবে। কর্মজীবনে যিনি কঠোর পরিশ্রমী, নিয়মানুবর্তী, সৎ এবং কর্তব্যপরায়ন তিনিই হবেন সৌভাগ্যবান। বাংলাদেশে মেধা ও দক্ষতার অভাব নেই, অভাব হলো শৃঙ্খলা ও জাতীয় চেতনাবোধের।-----ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম

আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত প্রাণ, যিনি আর্তদের জন্য আজীবন নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি আমাদের জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম। যিনি ফুটপাত ও বৃক্ষতল থেকে কায়াহীন, কঙ্কালসার এবং স্পন্দনহীন প্রাণকে তুলে এনে বাঁচার স্বপ্ন, ছন্দায়িত জীবনের আলো দেখিয়ে ছিলেন, তিনি আর কেউ নয়_আমাদের প্রিয় চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞানী ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম।

ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিমের জন্ম ১৯১১ সালের ৩১ দিসেম্বর। মুর্শিদাবাদ জেলার ভরৎপুর থানার খাঁড়েরা গ্রামে। তিনি ৪ ভাই-বোনের মধ্যে বড় সন্তান। তালপাতায় কয়লার কালি দিয়ে বাঁশের কঞ্চির কলম দ্বারা ববর্ণমালা লেখার হাতেখড়ি দেন গৃহ শিক্ষক হযরত উল্লাহ খান। তখনকার দিনে গৃহ শিক্ষককে ওস্তাদজী বলে ডাকা হতো। ওই ওস্তাদজীর কাছে তিনি বাংলা মাধ্যম পড়া শেষ করে এডওয়ার্ড ইংলিশ হাই স্কুলে ভর্তি হন। এই  স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করার পর তিনি কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। আইএসসি পাশ করে কলিকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে তিনি পড়াশুনা শেষ করে ডাক্তার হয়ে বের হন।

বাবা শেখ কিসমৎ উল্লাহ, মা আজিমুননেসা। উভয়ই ছিলেন মুক্ত মনের মানুষ। ছিলেন শিক্ষা ও ধর্মানুরাগী এবং পরোপকারী। তাঁদের স্নেহ-যত্নের কারণেই ইব্রাহিম তাঁর জীবনের লক্ষ্যে পৌছাতে পেরেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন মানবদরদী ও পরোপকারী।

কোলকাতা মেডিকেল কলেজে ১৯৩৯-৪১ সাল পর্যন্ত হাউজ অব ফিজিশিয়ান, ১৯৪১-৪৩ সাল পর্যন্ত ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার, ১৯৪৩-৪৫ সাল পর্যন্ত সিনিয়র ডেমোনেস্টেটর অব প্রাক্টিক্যাল ফার্মেসি বিভাগে চাকুরী করেন।

১৯৪৬ সালে তিনি এম.আর.সি.পি কোর্সে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। সেখান থেকে দেশে এসে যক্ষ্মা রোগের উপর গবেষণা করেন এবং আরো বেশী অভিজ্ঞতার জন্য ১৯৪৯ সালে ডেনমার্কে যান। দেশে এসে তিনি ১৯৫৬ সালে ডায়াবেটিক এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ  প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এসময়ে তিনি মিটফোর্ড হাসপাতালের টিবি সেন্টারে সুপারিয়েন্টন্ডেটের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ১৯৬০-৬২ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে এডিশনাল ফিজিশিয়ান এবং প্রফেসর অব ক্লিনিক্যাল মেডিসিনের দায়িত্ব পালন করেন। মিটফোর্ট হাসপাতাল ১৯৬২ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার পর তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে (১৯৬২-৬৪) যুক্ত হন। ১৯৬৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী তিনি সলিমুল্লাহ থেকে বদলি হয়ে করাচিতে চলে যান। ১৯৬৪-৭১ সাল পর্যন্ত করাচিতে তিনি জিন্নাহ পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিকেল কলেজের ডাইরেক্টর ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তান সরকার তাঁকে আটকে রাখে। অবশেষে হজ্জে যাওয়ার সুত্রধরে মক্কা থেকে লন্ডনে গিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৫ সালের ৪ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্ঠা হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে ডায়াবেটিক সমিতির জন্য শাহাবাগে জায়গা পান। এর পূর্বে তিনি সারা দেশে থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ডায়াবেটিক চিকিৎসাকে যুক্ত করে ছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও জায়গায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মণের জন্য অনুমোদন দেন। শাহাবাগে নির্মিত হয় বার্ডেম হাসপাতাল। ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম ১৯৫৬ সালে টিনশেটে ৩৯ জন রোগী নিয়ে এ হাসপাতাল বানানোর যাত্রা শুরু করেছিলেন। যা ১৯৮২ সাল থেকে শুরু করে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বীকৃত। ১৯৮৪ সালে তাঁর উদ্যোগে অসহায় প্রবীণদের জন্যএকটি আন্তর্জাতিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। গরীব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের জন্য সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাসহ চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানীই ছিলেন না, একজন সমাজবিজ্ঞানীও ছিলেন। সমাজের মানুষের মঙ্গল কামনাইয় কাজ করাই ছিল তাঁর ধর্ম। তিনি ১৯৮৯ সালেরে ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান। জয়তু ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম।             

     

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.