কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের পুরোধা

সৃষ্টি করেছেন সাহিত্যের নব নব দিগন্ততাঁর সৃষ্টির গুণগতমান শিল্প-বিচারে বিশ্বমানেরশিল্প- সংস্কৃতির সকল ধারায় তিনি যুক্ত ছিলেনশুধু যুক্ত থাকা নয়, সৃষ্টির মাঝেও তিনি শ্রেষ্টতাঁর লেখা বা সৃষ্টি নিয়ে সবাই বিস্ময় প্রকাশ করতে বাধ্য হয়এক জীবনে যার লেখা পড়ে শেষ করা সম্ভব নয়, তিনিই হলেন রবীন্দ্রনাথযিনি সাহিত্যের ক্ষেত্রে অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেনমানুষের যাপিত জীবনের বাহিরেও যে আরো কত জগৎ, আছে তা আমরা তাঁর গল্প ও উপন্যাস পড়ে পাইগভীর জীবনবোধ ও তীক্ষ্ণ বিচারবোধের সাক্ষাত্‍ মিলে তাঁর লেখায়তিনি ছিলেন উপন্যাসিক, গল্পকার, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার ও দার্শনিকতিনি তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পানবিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে তিনি বিশ্বকবি, কবিগুরু ও গুরুদেব নামে পরিচিততিনি বিশ্বের একমাত্র কবি যিনি দুটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতাবাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত আমার সোনার বাংলা এবং ভারতের জাতীয় সঙ্গীত জন গণ মন উভয়টির তিনিএই মহান মানবতাবাদী দার্শনিক-কবি আজও অনির্বান শিখার মতোই আলো ছড়াচ্ছেন সাহিত্য ভূবনে

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মেকলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতেবাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরমা সারদা দেবী১৪ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন ১৩তমতার ডাক নাম ছিল রবি১৮৭৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তার বাবার সাথে ভারত ভ্রমণে বের হনভারতের বিভিন্ন স্থানে শান্তিনিকেতন, অমৃতসর এবং হিমালয় ও ডালহৌসিতে যানসেখানে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির জীবনী পড়েনঅধ্যয়ন করেন ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আধুনিক বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতএছাড়াও তিনি কালিদাসের ধ্রুপদি কাব্যের সাথে পরিচিত হন১৮৭৭ সালে তার কিছু সাহিত্যকর্ম প্রথম প্রকাশিত হয়এর মধ্য ছিল মৈথিলি ভাষার সাংস্কৃতিক আদলে রচিত কিছু সুদীর্ঘ কবিতাএ ধরণের কবিতা প্রথম লিখেছিলেন কবি বিদ্যাপতি১৮৮২ সালে তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ সন্ধ্যা সংগীত প্রকাশিত হয়যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ নামক বিখ্যাত কবিতাটি

১৮৭৮ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ডে যানব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হনতারপর ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে পড়াশোনা করেনকিন্তু ১৮৮০ সালে কোনো ডিগ্রি অর্জন ছাড়াই তিনি দেশে ফিরে আসেন১৮৮৩ সালে তিনি মৃণালিনী দেবীকে সহধর্মিণী করেনজন্মের সময় মৃণালিনীর ডাক নাম ছিল ভবতারিণীতাঁদের সংসারে পাঁচ সন্তানের জন্ম হয়েছিলযার মধ্যে ২ জন শিশুকালেই মারা যায়

১৮৯০ সালে তিনি শিলাইদহে বাবার সম্পত্তির দেখাশোনার দায়িত্ব নেন১৮৯৮ সালে শিলাইদহে পরিবারসহ বসবাস শুরু করেনএ সময় তিনি আরামদায়ক জীবন ত্যাগ করে পদ্মার পাড়ে বিপুল পরিমাণ এলাকা ভ্রমণ করেনগ্রাম্য অধিবাসীদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করার দায়িত্ব ছিলো তারবিভিন্ন স্থানে তার সম্মানে গ্রামের লোকেরা উৎসবের আয়োজন করতোএ সময় তিনি অনেকগুলো গল্প রচনা করেনযাতে মোট ৮৪টি ছোট গল্প রয়েছে

প্রথম নাটক বাল্মিকী প্রতিভা তিনি লেখেন বিশ বছর বয়সে১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ বিসর্জন রচনা করেন যা তাঁর রচিত সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক হিসেবে অনেকে বিবেচনা করেন৩২ পরের দিকে রচিত নাটকগুলিতে রবীন্দ্রনাথ রূপকের বেশী ব্যবহার করেছেনযার মধ্যে ডাকঘর অন্যতমরবীন্দ্রনাথের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাটক চন্ডালিকারবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বিখ্যাত নাটক রক্তকরবীতার উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে চিত্রাংগদা, রাজা, এবং মায়ার খেলা

১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে যানএখানে তিনি একটি আশ্রম স্থাপন করেনএই আশ্রমে তিনি গড়ে তোলেন একটি মন্দির, একটি পরীক্ষামূলক বিদ্যালয়, বাগান এবং গ্রন্থাগারএখানেই রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী এবং দুই সন্তানের মৃত্যু ঘটে

১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি তাঁর বাবা দেবেন্দ্রনাথ মারা যানবাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি মাসিক ভাতা ও বেতন পেতে শুরু করেনএছাড়াও তিনি ত্রিপুরার মহারাজা, পারিবারিক গহনার ব্যবসা থেকে অর্থ পেতেন১৯০১ সালে নৈবেদ্য এবং ১৯০৬ সালে খেয়া কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়১৯১২ সালে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময় তিনি তার এক তাক বই নিয়ে যান১৯১২ সালের ১০ নভেম্বর ঠাকুর যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য ভ্রমণে যানযুক্তরাজ্যে তিনি অ্যান্ড্রুজের চাকুরিজীবী বন্ধুদের সাথে বাটারটন এবং স্ট্যাফোর্ডশায়ারে অবস্থান করেছিলেন১৯১৬-১৭ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত তিনি জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বক্তৃতা করেনএইসব বক্তৃতায় তিনি জাতীয়তাবাদ- বিশেষত জাপানী এবং মার্কিন জাতীয়তাবাদের নিন্দা করেনতিনি ভারতে জাতীয়তাবাদনামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেনবিশ্বজনীন শান্তিবাদে বিশ্বাসীরা অবশ্য এর প্রশংসাই করে থাকেন যেমন করেছেন রোমাঁ রোঁলা

১৯১৩ সালে ১৪ নভেম্বর তিনি নোবেল পান১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের নিকটে অবস্থিত সুরুল নামক গ্রামে পল্লী পুনর্নিমাণ সংস্থানামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনতিনি পরবর্তীকালে নাম পরিবর্তন করে শ্রীনিকেতন নাম রাখেনএ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রামের মানুষদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করেন১৯২৪ সালের ৬ নভেম্বর তিনি আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়র্‌স যান১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে দেশে আসেনওই বছরের ৩০ মে তিনি ইতালির নেপ্‌লসে পৌঁছেনপরদিন ইতালির ফ্যাসিবাদী একনায়ক বেনিতো মুসোলিনির সাথে সাক্ষাৎ করেন১৯২৬ সালের ২০ জুলাই রবীন্দ্রনাথ প্রথম মুসোলিনির বিরুদ্ধে কথা বলেন

১৯২৭ সালে বালি, জাভা দ্বীপ, কুয়ালালামপুর, মালাক্কা, পেনাং, সিয়াম এবং সিঙ্গাপুর ভ্রমণ করেনতার সে সময়কার ভ্রমণকাহিনী যাত্রীনামক রচনায় স্থান পেয়েছে১৯৩০ সালের তিনি ইউরোপ এবং আমেরিকায় বছরব্যাপী সফরের যানসফর শেষে যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার পর লন্ডন এবং প্যারিসে তার চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়এসময় তিনি বার্মিংহামে ধর্মীয় ভ্রাতৃসংঘের আশ্রয়ে অবস্থান করছিলেনএখানে বসে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তার বিখ্যাত হিবার্ট ভাষণ প্রস্তুত করেনতার এই ভাষণের বিষয় ছিল আমাদের ঈশ্বরের মানবতাবোধ এবং মানুষ ও পরমাত্মার স্বর্গীয় রূপতার পরবর্তী সফর ছিল ডার্টিংটন হলে অবস্থিত আগা খান ৩-ডার্টিংটন হলেই তিনি অবস্থান করেছিলেনএরপর ভ্রমণ করেন ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড এবং জার্মানি১৯৩০ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়টা এভাবেই কেটে যায়এরপর যান সোভিয়েত ইউনিয়নেসর্বশেষে ১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে ইরানের শাহ রেজা শাহ পাহলভি তাকে সরকারীভাবে আমন্ত্রণ জানানরবীন্দ্রনাথ নিজেও ইরানী কবি হাফিজের অতিন্দ্রীয় ফরাসি সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেনশাহের আমন্ত্রণে তিনি ইরানে যান

১৮৭৮-৩২ সাল পর্যন্ত তিনি পাঁচটি মহাদেশের ৩০টিরও বেশী দেশ ভ্রমণ করেনউদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষের বাইরে এবং অবাঙালি পাঠক এবং শ্রোতাদেরকে তার সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়া

১৯৩৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ভারতের বিহার রাজ্যে সংঘটিত প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প সম্বন্ধে মহাত্মা গান্ধী মন্তব্য করেছিলেন যে, এটি দলিতদেরকে বশীভূত করার জন্য ঈশ্বরের একটি প্রতিশোধরবীন্দ্রনাথ এই মন্তব্যের জন্য গান্ধীকে জনসমক্ষে তিরস্কার করেনএ সময় ১০০ লাইনের একটি মিত্রাক্ষর বর্জিত কবিতায় তিনি তার এই বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটানওই বছর রবীন্দ্রনাথ এসময় তার লেখার সংকলন ১৫টি খণ্ডে প্রকাশ করেনএই সংকলনের অন্তর্ভুক্ত ছিল পুনশ্চ, শেষ সপ্তক, পাত্রপুটজীবনের শেষ বছরগুলোতে বিজ্ঞান বিষয়ে তিনি বিশেষ আগ্রহের পরিচয় দেন যার প্রমাণ তার রচিত বিশ্ব পরিচয়প্রবন্ধ সংকলনতিনি জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়ন করেনতার সে সময়কার কবিতা এবং সাহিত্যকর্মে বিজ্ঞানের প্রাকৃতিক নিয়মের প্রতি তার বোধগম্যতা আমাদেরকে সে প্রমাণই দেয়

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিবিধ দর্শনের প্রভাব রয়েছেতিনি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার প্রতিবাদ করেনভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন দেনহিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্রের কথা তিনি জানতেন বলে পরবর্তীতে প্রমাণ পাওয়া যায়এই ষড়যন্ত্রের জন্য জাপানী সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী কাউন্ট তেরাউচি ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কাউন্ট ওকুমার সাথে আলাপ করেনতবে একই সাথে তিনি স্বদেশী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিলেন১৯২৫ সালের একটি প্রবন্ধে এই আন্দোলনকে চরকার পাগলামী বলে আখ্যায়িত করেনদেশকে স্বাধীন করার জন্য অসহযোগ ও সশস্ত্র আন্দোলনের বদলে তিনি স্বনির্ভরতা ও জনমানুষের আত্মিক উন্নতির উপরে যোগ দেনতাঁর মতে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অশুভ নয়, বরং সামাজিক সমস্যার রাজনৈতিক রূপতিনি ভারতবাসীকে এই শাসন মেনে নিতে আহবান জানিয়েছিলেন

জীবনের শেষ চার বছর রবীন্দ্রনাথের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ছিলএই দুরারোগ্য অসুস্থতা দুই বছর স্থায়ী ছিল১৯৩৭ সালের শেষ দিকে তিনি চেতনা হারিয়ে ফেলেনদীর্ঘ সময় মুমূর্ষু অবস্থায় ছিলেন তিনি১৯৪০ সালে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েনযা থেকে আর আরোগ্য লাভ করতে পারেন নিদীর্ঘদিন রোগ ভোগের পর ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট তিনি মারা যান

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.