সিমোন দ্য বোভোয়ার

অনেকেই তাঁকে অপভাষায় চিঠিপত্র লেখেন এবং ক্যাথলিকদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ভ্যাটিকান চার্চ বইটিকে অনৈতিকবলেও নিষিদ্ধ করে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৯০৮ সালের ৯ জানুয়ারি জন্ম বোভোয়ারেরবাবা জর্জে বেরত্রা দ্য বোভোয়ার ছিলেন পেশায় আইনজীবী এবং ধর্মীয় প্রশ্নে সন্দেহবাদী এবং একাধারে প্যারিসিও বিশ্ব নাগরিকঅন্যদিকে মা ফ্রাঁসোয়া ব্রাসেয়ো ছিলেন গোঁড়া ক্যাথলিকদুবোনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান সিমোন বোভোয়ারকে অনেকটা পুত্রের মতো করেই বড় করেছেন তাঁর বাবাকারণ তিনি মনে করতেন পুরুষের মগজ সিমোনের এবং সে চিন্তাও করে পুরুষের মতোছোটবেলা থেকেই নিজের চারপাশকে বুঝতে শুরু করেছিলেন সিমোনপ্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে উঠলে সিমোন দেখতে পান উদয়াস্ত কী দুঃসহ ক্লান্তিকর গৃহস্থালির কাজ করতে হয় তাঁর মাকেএই ক্লান্তির মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন তিনি দ্বিতীয় লিঙ্গ গ্রন্থেমা আর অন্য নারীদের গৃহকর্মে বাঁধা জীবন আতঙ্কিত করে সিমোনকেদ্বিতীয় লিঙ্গগ্রন্থটিতে তাই এক তরুণীর দেখা পাওয়া যায় যে তাঁর মায়ের একঘেয়ে গৃহস্থালির কাজ দেখে ভীত হয়ে ভাবে যে একদিন সে নিজেও বাঁধা পড়বে ওই নির্মম নিরর্থক নিয়তিতে এবং স্থির করে যে কখনো মা আর গৃহিনী হবে না সেসিমোনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভও ঘটেছে প্যারিসে১৯২৯ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে সর্বনেদর্শনে এগ্রিগেশন পরীক্ষায় পাশ করেন তিনি এবং এ পর্যন্ত ফ্রান্সে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সে এই ডিগ্রিধারী হনপরীক্ষায় জাঁ-পল সার্ত্র হন প্রথম আর সিমোন দ্বিতীয়ফলে গড়ে ওঠে দুজনের বন্ধুত্ব যা রূপ নেয় এক ব্যতিক্রমী প্রেমের সম্পর্কে১৯৩০-এর দশকের জন্য যদিও তাঁদের এই সম্পর্ক সমাজের চোখে ছিল খুবই অপ্রথাগতকেননা তাঁরা একসাথেও থাকতেন না, আবার লিভ টুগেদার-ও করতেন নাবিয়ে করে একসঙ্গে থাকা আর্থিকভাবে সুবিধাজনক মনে হলেও তাঁরা এ পথ বেছে নেননি, কারণ তাদের মনে হয়েছে বিয়ে এমনকি একত্র বাস মানুষের জন্য ক্ষতিকর, যেহেতু এ ব্যবস্থায় একজন হয়ে উঠতে চায় কর্তাআর অপরজনকে পরিণত করতে চায় কর্মেবিশ শতকের অন্যতম এই দুই দার্শনিক পরস্পরকে প্রভাবিত করেছেন প্রচণ্ডভাবে নিজ নিজ চিন্তা ও কাজের দ্বারাঅবিবাহিত সন্তানহীন সিমোন আমরণ ডুবেছিলেন সার্ত্রের গভীর বন্ধুত্বে, যদিও অন্য প্রেমের কাছেও তিনি ধরা দিয়েছেন মাঝে মধ্যে

জীবিকার জন্য মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন সিমোন দ্য বোভোয়ার আর নিজের মধ্যে মিলিয়েছেন কর্ম ও জ্ঞানকেফ্রান্সের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও নানা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংঘটিত সংগ্রামের কেন্দ্রেও ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতিতাঁর লেখা উপন্যাসগুলোর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, লেখকদের কীভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হয় সময়ের কাছেতাঁর যুগান্তকারী ল্য দ্যাজিয়ম, বাংলায় যা দ্বিতীয় লিঙ্গবইটি পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতায় নারীর পরিস্থিতির এক ধ্রুপদী দার্শনিক, সমাজতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যচিরন্তনী নারীর ধারণা পিতৃতন্ত্রের ধর্মে, দর্শনে, সাহিত্যে এবং অন্য সবকিছুতে এক ধ্রুব ব্যাপার বলে গৃহীত, কিন্তু সিমোন ধর্ম, পুরান, মনোবিজ্ঞান, সাহিত্য ঘেঁটে তার অসারত্ব তুলে ধরেনভাষার শিল্পীত সৌন্দর্য ও লেখকের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে ল্য দ্যজিয়ম(সেকেন্ড সেক্স) হয়ে ওঠে আধুনিক নারীবাদের মূলগ্রন্থতিনি বলেছেন, ‘স্ত্রীলিঙ্গ তার প্রজাতির শিকার, কারণ প্রজননের মাধ্যমে কেউ মানুষ হয়ে উঠতে পারে নামানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে হয় সৃষ্টি ও নির্মাণের মধ্য দিয়েপুরুষ চেষ্টা করে নিজের জন্য অধিকতর স্বাধীনতা সৃষ্টির কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে সে নারীকে বঞ্চিত করেছে আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাভিলাসের অধিকার থেকেনারীকে তাই মানুষহয়ে উঠতে দেয়া হয়নিপুরুষতন্ত্র তৈরি করেছে একরাশ বিপরীত ধারণা যার একটি ধনাত্মক বা প্রয়োজনীয় বা কর্তাঅপরটি ঋণাত্মক বা অপ্রয়োজনীয় বা কর্ম, যেমন পুংলিঙ্গ : স্ত্রীলিঙ্গ, সংস্কৃতি : প্রকৃতি, মানুষ : পশু, উৎপাদন : প্রজনন, সক্রিয় : অক্রিয়এ ধারণাগুলোর মধ্যে প্রথমটি শুভ, বিপরীতটি অশুভ এবং পুরুষতন্ত্র প্রথমটি নিজের জন্য রেখেছে, বিপরীতটি নারীর জন্যপুরুষ ভবিষ্যতের রূপকার, সৃষ্টিশীল এবং আবিষ্কারক; আর এটাই তাকে ভিন্ন করে তোলে পশুর থেকেসিমোন তাই চিরন্তনী নারীত্বকে বাতিল করে নারীর জন্য চেয়েছেন পুরুষের গুণতিনি চেয়েছেন নারী ও পুরুষের সাম্য ও প্রীতিপূর্ণ বিকাশ

ল্য দ্যজিয়ম-এর পর সিমোন লেখেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস লে মাঁদারেদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফরাসি বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে তাদের ম্যান্ডারিনমর্যাদা বা অভিজাত অবস্থানে ছেড়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন উপন্যাসটি তারই বিবরণউপন্যাস ছাড়াও সিমোন লিখেছেন ভ্রমণকাহিনী৪টি আত্মজৈবনিক বই এবং অসংখ্য প্রবন্ধপ্রচলিত অর্থে তিনি নিজেকে নারীবাদী বলতে নারাজ ছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করেছেন যে সমাজতন্ত্রের বিকাশের সাথে সাথে আপনাআপনি সমাধান হয়ে যাবে নারীর সমস্যাঅতএব তাঁর সংজ্ঞার নারীবাদী বলতে সেই নারী বা পুরুষকে বোঝায় যিনি সংগ্রাম করছেন নারীর অবস্থা বদলের জন্য, যার সাথে থাকছে শ্রেণীসংগ্রাম এবং যাঁরা শ্রেণীসংগ্রাম নিরপেক্ষভাবেও, সমাজের অন্য যে কোন বদলের ওপর নির্ভর না করেও নারীর অবস্থা বদলের জন্য সংগ্রাম করতে পারেন

১৮৮৬ সালের ১৪ আগস্ট সিমোন দ্য বোভোয়ারের মৃত্যু হয় প্যারিসেততদিনে তিনি হয়ে উঠেছেন নারীর সাম্য ও অধিকার আদায়ের বিশ্বজনীন প্রতীক

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.