সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকঃ প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা

সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিকের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৪ জুন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায়। বাবা ছিদ্দিক আহমেদ ছিলেন শিক্ষক। মায়ের নাম আলিফা খাতুন। উভয়ে ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সমাজ হিতৈষী। নয় ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার ধনিকুণ্ড গ্রামে।
পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারের কাছে। তাঁর শৈশব-কৈশর কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি শহরে। শিশুকাল থেকে তিনি ছিলেন প্রচণ্ড স্মরণশক্তি সম্পন্ন। পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তাঁর প্রচুর ঝোক ছিল। যে কারণে তিনি বড় হয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের অন্যতম খ্যাতিমান ক্রিকেটর জাতীয় দলে খেলার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ঢাকার গোপীবাগে পিতা-মাতার নতুন পত্তনের ঠিকানায় মানিক বসবাস করতেন।
কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট ডিগ্রী নেওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখানে পড়াশুনা করার সময় তিনি ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত হন। এক পর্যায়ে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যমে যুক্ত হন সংস্কৃতি সংসদের সাথে। এটি ছিল ওই সময়ের সর্বশ্রেষ্ট সংস্কৃতি সংগঠন। এই সংগঠনের মূল নেতৃত্বে ছিল ছাত্র ইউনয়ন। ষাটের দশকের গোডার দিকে সংস্কৃতি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের অগ্রণী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

খেলাধুলা ও রাজনীতির কারণে তাঁর পড়াশুনার জীবন অনেকখানি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে। প্রবেশিকা পাশের পর তিনি কলেজ জীবনে এসে ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেন। যুক্ত হন পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে। ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যে শিক্ষা আন্দোলনক সংগঠিত হয়, তাতে যে সকল ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ভূমিকা রাখেন তাদের মধ্যে সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক অন্যতম।
স্বৈরাচার আইয়ুব শাসন বিরোধী যে ছাত্র আন্দোলন পূর্ব-পাকিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে_ তার প্রথম সারির নেতৃত্বের মধ্যেও তিনি অন্যতম। সাংস্কৃতিক কর্মী থেকে তিনি ক্রমেই ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক সংগ্রামের নেতৃত্বে চলে আসেন। সভা-সমাবেশের বক্তৃতায়, মিছিলের শ্লোগানে, পোস্টার লাগানো ও দেওয়াল লিখনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকার রাস্তার দেওয়াল লিখনকে ‘চিকা মারা’ নামে পরিচিতি দেয়ার ব্যাপারটি তিনি ও তার সহকর্মী সেলিমরাই চালু করেন।
১৯৬৪ সালে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ওই বছর তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে দ্বিধাবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়নের উভয় গ্রুপ তাকে সাধারণ সম্পাদক করে। কারণ ছাত্র নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয়। এ সময় তিনি মেনন গ্রুপকে প্রত্যাখান করে মতিয়া গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক হন।
১৯৬৬ সালে পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ১০ তম সম্মেলনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জন্য গ্রেফতারী পরয়ানা মাথায় নিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় শিক্ষকদের সহয়তায় ১৯৬৭ সালে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ ডিগ্রী অর্জন করেন।
ষাটের দশকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, অধিকার,  স্বাধীনতা ও রাজনীতি-সংস্কৃতির আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্বে ছিল ছাত্রসমাজ, সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীগণ।  সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক প্রথমে সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে পরবর্তীতে ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বাঙ্গালী জাতির জাতীয় জাগরণে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর নেতৃত্বে পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করে। অবশ্য এসময় তাকে সকল কাজে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ সহযোগিতা করতেন। ওই বছর সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক সাবেক ছাত্র নেত্রী, মহিলা নেত্রী এবং চিকিৎসক ডা. ফওজিয়া মোসলেমেকে সহধর্মীনী করেন। মানিক-ফৌজিয়া দম্পতির দুই মেয়ে জয়া ও গীতি।
১৯৬৯ সালেই তিনি ছাত্র রাজনীতি থেকে বিদায় নেন। তারপর যুক্ত হন ট্রেড ইউনিয়নের সাথে। গড়ে তোলেন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ওই বছরই তিনি ডেমরায় লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের সিবিএ সভাপতি নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি সারা বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলন-সংগ্রামকে ছড়িয়ে দিলেন। সত্তর দশকে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি উজ্জ্বল নাম সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রথম সারির সংগঠক। তরুণ ছাত্র-ছাত্রী, শ্রমিক ও কৃষকদের রিক্রুট, ট্রেনিং, অস্ত্রশস্ত্র ও রসদের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি এবং কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনার যোদ্ধাদের অন্যতম পরিচালক ও সংগঠক ছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পন করেন।
১৯৭৩ সালে সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক কমিউনিষ্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালে কমিউনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের মৃত্যুর পর তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন তিনি ট্রেড ইউনিয়নের লড়াই-সংগ্রাম থেকে অব্যহতি নেন। কমিউনিষ্ট পার্টির পঞ্চম কংগ্রেসে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।
৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ৩ জোটের অভিন্ন রূপরেখা প্রনয়ণে কমরেড ফরহাদের পরেই তাঁর ভূমিকা মূখ্য।
নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়লে তার অভিঘাত বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনের উপর পড়ে। এ সময় রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণে সুবিধাবাদী অংশ (বড় অংশ) রূপান্তরের পক্ষে দাঁড়ায়। ফলে কমিউনিষ্ট পার্টি বিভক্ত হয়। সম্পত্তিও ভাগাভাগি হয়। বিলোপবাদীরা সব সম্পত্তি নিতে চেয়েছিল। অবশ্য মানিক ভাইর কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। সমবন্টন  হয়েছিল। সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিকসহ অনেকেই এই বিভক্তিকে রোধ করার জন্য প্রচেষ্ঠা চালান। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। অবশেষে তিনি ১৯৯৪ সালে গণফোরাম নামে একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গড়ে তোলার চেষ্ঠা করে সফল হন। তিনি এই দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৯৬ সাল হতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের বাম আন্দোলনের ঐতিহ্য ধারণ এবং বহুমুখী সামাজিক ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার লক্ষ্যে ‘মণি সিংহ ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্ট’ গঠিত হয়। সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক এই ট্রাস্টের সভাপতি নির্বাচিত হন।
রাজনীতির পাশাপাশি সাইফউদ্দিন মানিক ছিলেন খোলোয়াড়ও। জাতীয় ফুটবল লীগেও খেলেছেন তিনি। ছিলেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের আজীবন সদস্য। মৃত্যুর সময় তিনি ব্রাদার্স ইউনিয়নের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশ খো খো ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক ঊনসত্তর বছর বয়সে ২০০৮ সালের ৩ ফেব্র্বয়ারি মারা যান।







© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.