ধনতান্ত্রিক শোষণ: অনিল মুখাজী

দাস-প্রথার যুগে শোষণ ছিল এক রকম ক্রীতদাসরা পরিশ্রম করিয়া ধন সম্পত্তি উপাদন করিত এবং প্রভুরা (দাস-মালিক) সেই সম্পত্তি ভোগ করিতসামন্ততান্ত্রিক যুগে ভূমিদাসরা ছিল সমাজের উপাদকশ্রেণী, কিন্তু সম্ভোগ করিত সামন্তগণবর্তমানে, ধনিক সমাজে যে শোষণ ব্যবস্থা প্রবর্তিত আছে তাহাকে বলা হয় ধনতান্ত্রিক বা ধনিক (শোষণ) ব্যবস্থাপূর্ব পূর্ব সমাজে যে শোষণ ব্যবস্থা প্রবর্তিত ছিল তাহার সঙ্গে বর্তমান ধনতান্ত্রিক শোষণ ব্যবস্থার প্রভেদ এই যে, এই ব্যবস্থা অধিকতর নিপুণ, শোষণের রূপ সহজে ধরা যায় না, আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন এই ব্যবস্থা ন্যায়ের উপরই প্রতিষ্ঠিতএখন প্রশ্ন, ধনতান্ত্রিক শোষণটা কি এবং কিভাবেই বা ইহা চলে?

ধনিক সমাজে লাভবা মুনাফাকথাটা খুবই চলতি কথা, আমরা সদা সর্বদা ইহা ব্যবহার করিপ্রকৃতপক্ষে ধনিকের এই মুনাফা জিনিসটাই হইল ধনতান্ত্রিক সমাজের শোষণপুঁজিপতি (মূলধনের মালিক) কোনও ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানে যতটা মূলধন খাটায় তাহার চাইতে বেশী আদায় করেপুঁজিপতি নিজে কোন পরিশ্রম করে নাসে জায়গা-জমি, কলকব্জা, কাঁচামাল প্রভৃতি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত উপাদন শক্তিগুলি অর্থা পুঁজি যোগায় এবং কিছু মজুর নিয়োগ করে এই উপাদন শক্তিগুলি কাজে লাগাইবার জন্য, এইগুলি নিয়া খাটুনি খাটিয়া নতুন মূল্য সৃষ্টি করিবার জন্য। (জমি, কলকারখানা, কাঁচামাল, প্রভৃতি উপাদন শক্তিগুলি যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয় এবং এইগুলি যখন নতুন উপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয় তখন এইগুলিকে ব্যক্তিগত পুঁজি বলে।)

অর্থনীতিশাস্ত্রের ভাষায় মূল্য দুই প্রকারÑব্যবহারিক ও বিনিময়গতশুধু মূল্য বলিতে আমরা বিনিময় মূল্যকেই বুঝিমানুষের পরিশ্রম দ্বারা এই বিনিময় মূল্য সৃষ্টি হয় অর্থা যেহেতু কোনও একটা জিনিস তৈয়ার করিতে বা সাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করিবার জন্য লোকে পরিশ্রম করিয়াছে শুধু সেজন্যই জিনিসটা বাজারে অন্য জিনিসের সঙ্গে বিনিময় হয়অবশ্য যে সকল জিনিসের বিনিময় মূল্য আছে তাহাদের নিশ্চয়ই ব্যবহারিক মূল্যও আছে, অর্থা সেই জিনিসটা নিশ্চয়ই লোকের প্রয়োজনে লাগে, নতুবা সেই জিনিস লোকে নিবে কেন? কিন্তু যে সকল জিনিসের ব্যবহারিক মূল্য আছে তাহাদের সকলেরই বিনিময় মূল্য নাই, যদি না সেই ব্যবহারিক মূল্য সৃষ্টি করিবার জন্য লোকের পরিশ্রম হইয়া থাকেঅবস্থা ভেদে একই জিনিসের সময়ে বিনিময় মূল্য থাকিতে পারে, সময়ে না-ও থাকিতে পারেজল ও বাতাসের ব্যবহারিক মূল্য নিশ্চয়ই দুনিয়ার অন্য সকল জিনিস হইতে বেশী, কিন্তু এইগুলির কোন বিনিময় মূল্য নাই, এইগুলি বাজারে বিক্রয় হয় নাকিন্তু যে অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়া যায় না সেই অঞ্চলে যদি কেহ বিশুদ্ধ পানীয় জল দূর হইতে নিয়া আসে তাহা হইলে সেই পানীয় জলের বিনিময় মূল্য সৃষ্টি হয়তাহা পণ্য হিসাবে বাজারে বিক্রয় হয়, কেননা লোকের পরিশ্রমের ফলে উহা সর্বসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী হইয়াছেবন অঞ্চলে যেখানে কাঠ আপনা আপনি জন্মে সেখানে কাঠের কোনও বিনিময় মূল্য নাই কিন্তু এই কাঠই যখন কেহ পরিশ্রম করিয়া লোকালয়ে নিয়া আসে তখন ইহার বিনিময় মূল্য সৃষ্টি হয়আলো, বাতাস প্রভৃতি তো অফুরন্ত, কিন্তু অতিপ্রয়োজনীয় প্রকৃতির দানকে কেহ যদি ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করিতে পারে তাহা হইলে এইগুলি হইতেও সে ব্যক্তিগত অধিকারের বলে বিনিময় মূল্য আদায় করিতে পারেএই জন্যই শহরে আলো-বাতাসপূর্ণ বাড়ি ঘরের ভাড়া অপেক্ষাকৃত বেশি

কেহ কেহ হয়ত প্রশ্ন করিবেন, যদি পরিশ্রমের ফলেই বিনিময় মূল্য সৃষ্টি হয়, তাহা হইলে একই জিনিসের দাম এক সময় বেশী অন্য সময়ে কম হইবে কেন? ইহার দুইটি কারণ হইতে পারেপ্রথমতঃ একই জিনিস তৈয়ার করিতে সমাজে সব সময় একই মাত্রায় পরিশ্রম প্রয়োজন হয় নাযন্ত্রশিল্প আবিস্কৃত হইবার পূর্বে মানুষকে কোন জিনিস উপাদন করিবার জন্য যে পরিমাণ পরিশ্রম করিতে হইত, যন্ত্রশিল্প আবিস্কৃত হইবার ফলে সেই এক পরিশ্রমে বেশি জিনিস উপাদন হইতে পারে, এবং যন্ত্রশিল্পের যতই উন্নতি হইতেছে কোনও জিনিস উপাদন করিতে পরিশ্রমের মাত্রা ততই কমিয়া যাইতেছেএই জন্য পূর্বে শিল্প দ্রব্যের দাম যতটা ছিল, এখন সাধারণতঃ তাহার চাইতে সস্তাযন্ত্রশিল্পের ক্রমোন্নতির ফলে পণ্য মূল্যের যে পরিবর্তন ঘটে তাহা দুই চার দিনে হয় না

বাজারে দৈনন্দিন দামের মধ্যে যে উঠা নামা হয় তাহার কারণ অন্যরূপকোনও জিনিসের চাহিদা যদি হঠা খুব বাড়িয়া যায় এবং সেই জিনিস বাজারে যদি অপেক্ষাকৃত কম থাকে তাহা হইলে ব্যবসায়ী জিনিসের দাম চড়াইয়া দেয় এবং ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে জিনিসটা কিছু বেশী দামে বিক্রীত হয়পক্ষান্তরে কোনও জিনিসের চাহিদা যদি হঠা করিয়া কমিয়া যায় অথচ জিনিস চাহিদা অনুপাতে যদি বেশি মজুদ থাকে তাহা হইলে বিক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে জিনিসের দাম কিছু কমিয়া যায়বর্তমান যুগ একচেটিয়া পুঁজির যুগশুধু পণ্যের উপাদনে শ্রমিকদিগকে নির্মমভাবে শোষণ করিয়া মুনাফা করাই নয়, ক্রেতাদের নিকট হইতে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের জন্য (পণ্যের প্রকৃত মূল্য হইতে অধিক মূল্য আদায়ের জন্য) একচেটিয়া পুঁজি বাজারে কৃত্রিম অভাব বা প্রাচুর্যের সৃষ্টি করা, সাময়িকভাবে পণ্যের দর প্রকৃত মূল্য হইতেও অনেক কমাইয়া দেওয়া, প্রভৃতি নানারকম কারসাজি করেএইভাবে অবশ্য অর্থনীতি ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা সৃষ্টি হইয়াছেকিন্তু সে যাহাই হউক না কেন, শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির নিয়ম রোধ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়মূল নিয়মগুলিই আমোদের আলোচ্য

সাধারণতঃ বাজার দরের যে তারতম্য তাহা খুব বেশী উঠে না বা খুব বেশী কমেও না, আর এই তারতম্য খুব দীর্ঘস্থায়ীও হয় নাকোন জিনিসের চাহিদা বাড়িয়া গেলে ক্রমে উপাদনও বাড়িয়া যায়, আবার চাহিদা না বাড়িতে থাকিলে উপাদনও ক্রমে কমিতে থাকে; কিন্তু দামের যতই উঠা নামা হউক না কেন একচেটিয়া পুঁজিপতিদের যত রকম কারসাজিই চলুক না কেন, সকল জিনিসের দামেরই এমন একটা মাত্রা আছে যাহার নীচে ইহা যাইতে পারে না, যাহার নীচে গেলে ব্যবসায়ী লোকসান মনে করে এবং মালিক ক্রমে সেই জিনিস উপাদন বন্ধ করিয়া দেয়কাজেই চাহিদার তারতম্যের জন্য সাময়িকভাবে বাজার দরের তারতম্য হইতে পারে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হয় কোনও জিনিসের মধ্যে যতটুকু পরিশ্রম আছে তাহা দ্বারাবাজার দর যদি কখনও এই মূল্যের নীচে পড়িবার সম্ভাবনা ঘটে, মালিক তখন উপাদন কমাইয়া দেয় বা বন্ধ করিয়া দেয়

আমরা বলিয়াছি, কোনও জিনিসের মূল্য নির্ধরিত হয় সেই জিনিসের মধ্যে যতটুকু পরিশ্রম আছে তাহা দ্বারাকিন্তু একই জিনিস তৈয়ার করিতে সকল লোকের একই রকম পরিশ্রম লাগে না এই অবস্থায় কোন্ জিনিসের মূল্য কি হইবে তাহা ঠিক হয় কিভাবে এবং ভিন্ন ভিন্ন লোক দ্বারা তৈয়ারী একই জিনিসের মূল্য ভিন্ন ভিন্ন রকম হয় কেন? কোন্ জিনিসের মধ্যে কতখানি পরিশ্রম আছে তাহা ব্যক্তি বিশেষে পরিশ্রম দ্বারা নির্ধারিত হয় না, তাহা নির্ধারিত হয় সমাজে যতরকম উপায়ে ঐ জিনিসটি উপাদন হয় তাহার গড়পড়তা হিসাব করিয়াএকটি জিনিস তৈয়ার করিতে সেই সমাজে গড়ে যে পরিশ্রম লাগে তাহাকে সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় পরিশ্রম বলিয়া ধরা হয় এবং উহা দ্বারাই পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয়

পাদন শক্তিগুলিকে কাজে লাগাইবার জন্য মজুর যে পরিশ্রম করে তাহার পুরা দাম সে পায় না শ্রমজনিত যে মজুরি সে পায় তাহা শ্রম দ্বারা সে যতটা মূল্য সৃষ্টি করে তাহার চাইতে অনেক কমবাকীটা যায় পুঁজিপতির মুনাফা হিসাবেপুঁজির তথা সকল উপাদন শক্তিগুলির মালিক পুঁজিপতিগণইহার সাহায্য ব্যতীত শ্রমিক তাহার জীবিকা অর্জন করিতে পারে নাতাই পুঁজিপতিদেরই নির্ধারিত দরে সে তাহার শ্রম-শক্তি (পরিশ্রম করিবার ক্ষমতা) বিক্রয় করিতে বাধ্য হয়তাই শ্রম-শক্তি ব্যবহার করিবার ফলে কতটা মূল্য সৃষ্টি হইল তাহার সহিত মজুরের সম্পর্ক নাইপুঁজিপতি শ্রম-শক্তি কিনিয়া নিয়াছে, সে-ই এখন এই শ্রম শক্তিরও মালিক, শ্রম-শক্তি এখন একটি পণ্যবিশেষশ্রমিক তাহার বিক্রিত পণ্য শ্রম-শক্তির মূল্য বাবদ একটা মজুরি পায়কিন্তু শ্রমিকের শ্রম-শক্তির একটি বিশেষ গুণ এই যে, এই পণ্যটি উহার নিজ মূল্যের চাইতে অনেক বেশী মূল্য সৃষ্টি করিতে পারেমজুরের শ্রমশক্তি প্রয়োগ করিবার ফলে যে নূতন মূল্য সৃষ্টি হয় তাহার একটা অংশ মাত্র মজুরকে দেওয়া হয় তাহার মজুরি হিসাবে, বাকী অংশটা (এবং সাধারণতঃ সেটাই সিংহভাগ) পুঁজিপতি মুনাফা হিসাবে আত্মসা করেমজুরি আর মুনাফা দু-ই মজুরের শ্রম-শক্তি দ্বারা সৃষ্ট নূতন মুল্যএই মূল্যেরই একটা অংশ মজুর তাহার মজুরি বাবদ পায় এবং অবশিষ্ট বাড়তি মূল্যটামালিক তাহার মুনাফা হিসাবে নেয়এই মুনাফা জিনিসটা যে মজুরের শ্রমলব্ধ মূল্যেরই একটা অংশবিশেষ তাহা আমরা দুই একটা উদাহরণ হইতে বুঝিতে চেষ্টা করিবধরা যাক, কোন একজন কাঠমিস্ত্রী আট আনা দামে কিছু কাঠ কিনিল এবং নিজের ঘরে নিজের যন্ত্রপাতির সাহায্যে দুই দিন (দৈনিক আট ঘণ্টা) পরিশ্রম করিয়া একটা চেয়ার তৈয়ার করিলএই চেয়ার বাজারে পাঁচ টাকায় বিক্রয় হইলচেয়ার বাবদ খরচ পড়িয়াছে- কাঠ আট আনার, ঘরভাড়া ধরা যাক দুই দিনে চার আনা, রং বার্নিশ যন্ত্রপাতি খরচ প্রভৃতি বাবদ আরও বার আনা- মোট খরচ দেড় টাকাকিন্তু চেয়ারটা পাঁচ টাকায় বিক্রয় হওয়াতে স্বাধীন কাঠমিস্ত্রীর দুই দিনে আয় হইল সাড়ে তিন টাকা (চেয়ারের দাম পাঁচ টাকা হইতে খরচ বাবদ দেড় টাকা বাদ দিয়া)এই সাড়ে তিন টাকা হইল মিস্ত্রীর দুই দিনের খাটুনি বা পরিশ্রমের মূল্যসে কাঠ, যন্ত্রপাতি, প্রভৃতি লইয়া দুই দিন পরিশ্রম করিবার ফলেই চেয়ার তৈয়ার হইয়াছে এবং নূতন সাড়ে তিন টাকা মূল্য সৃষ্টি হইয়াছে (কাঠের দাম, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য সকল জিনিস বাবদ যে খরচ গিয়াছে তাহা বাদ দিয়া দেখা গেল সাড়ে তিন টাকা নূতন মূল্য সৃষ্টি হইয়াছে)

অন্য একজন কাঠমিস্ত্রীর কথা ধরা যাক, তাহার নিজের কোন যন্ত্রপাতি অর্থা কোন পুঁজিই নাইসে একটা আসবাবপত্রের কারখানায় মজুর হিসাবে কাজ করে এবং মজুরি পায় (দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করিয়া) এক টাকাসে দুই দিন কাজ করিয়া আট আনার কাঠ হইতে একটি চেয়ার তৈয়ার করিল এবং চেয়াখানাও বাজারে পাঁচ টাকায় বিক্রয় হইলএই ক্ষেত্রেও দুদিনের ঘর ভাড়া পড়িয়াছে চারি আনা এবং যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য খরচ বাদ গিয়াছে আরও অতিরিক্ত বার আনাকিন্তু এই ক্ষেত্রে কাঠের দাম, ঘরভাড়া, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি বাবদ মোট দেড় টাকা বাদ দিয়া বাকী সাড়ে তিন টাকা মজুর কাঠমিস্ত্রী পাইবে নামজুর কাঠমিস্ত্রীকে দেওয়া হইবে দুই দিনের মজুরি বাবদ দুই টাকাতাহার পরিশ্রমে সৃষ্ট মূল্যের বাকী অংশটা অর্থা নূতন সাড়ে তিন টাকা হইতে দুই টাকা বাদ দিলে যে দেড় টাকা থাকে তাহা আসবাবপত্রের কারখানার মালিক মুনাফা বাবদ লইবেএই ভাবে মজুর কাঠমিস্ত্রীর পরিশ্রমের ফলে উপন্ন মূল্যের একটা বড় অংশ মালিক ভোগ করিবে উপাদনের উপায়গুলির উপর (কারখানা যন্ত্রপাতি, কাঠ প্রভৃতির উপর) তাহার মালিকানা স্বত্বের জোরেআর একটি উদাহরণ ধরা যাকএকটি কাপড়ের মিলে বসরের তুলা আসিল মোট পঞ্চাশ হাজার টাকার, রং-মাড় প্রভৃতি বাবদ খরচ পড়িল পাঁচ হাজার টাকা, যন্ত্রপাতির বাসরিক ক্ষয় বাবদ খরচ পড়িল পাঁচ হাজার টাকা, কয়লার খরচ পাঁচ হাজার টাকা, জায়গা, কারখানা, ঘর ও খাজনা বাবদ পড়িল পাঁচ হাজার টাকা এবং অন্যান্য নানা রকম বাজে খরচ বাবদ গেল অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকাএইভাবে মোট পঁচাত্তর হাজার টাকা খরচ করিয়া যে কাপড় প্রভৃতি উপন্ন হইল তাহা বাজারে বিক্রি হইল দেড় লক্ষ টাকায়কারখানায় মজুরদের মজুরি ও কর্মচারীদের বেতন বাবদ মালিকের ব্যয় হইল পঁচিশ হাজার টাকাতুলা, কয়লা, কারখানা প্রভৃতি উপাদন শক্তিগুলি বাবদ পঁচাত্তর হাজার ও মজুরদের মজুরি বাবদ পঁচিশ হাজার, মোট এক লক্ষ টাকা খরচ করিয়া মালিক বা মালিকগণ বাকী পঞ্চাশ হাজার টাকা (কাপড়ের দাম দেড় লক্ষ টাকা হইতে মোট ব্যয় বাবদ এক লক্ষ বাদ দিয়া) নিজেদের মধ্যে কমিশন, ডিভিডেণ্ড প্রভৃতি বাবদ ভাগ করিয়া লইলতুলা, কয়লা, কারখানা, প্রভৃতি সব কিছুর খরচ ঠিক ঠিক মত চুকাইয়া এই পঞ্চাশ হাজার টাকা মালিকের মুনাফা আসিল কোথা হইতে? পূর্বে যে কাঠমিস্ত্রীর কথা উল্লেখ করিয়াছি তাহা হইতে আমরা বুঝিতে পারি যে মালিকদের এই লাভ শ্রমিকদের পরিশ্রম-সৃষ্ট মূল্যের একটা অংশ, শ্রমিকদের বঞ্চিত করিয়া মালিক ইহা ভোগ করেযেহেতু উপাদনের উপায়গুলির মালিক সে, সেইজন্য মজুর হিসাবে নিয়োজিত শ্রমিক বাধ্য হইয়া মালিকের এই অন্যায় জুলুম সহ্য করিতেছেনিজে পরিশ্রম না করিয়া লোক যে টাকা আয় করে তাহা সমস্তই এইভাবে অন্যকে শোষণ করিবার ফলে আসেলাভ বা মুনাফা নামক যে জিনিসটা প্রথম দৃষ্টিতে মালিকের ন্যায্য পাওনা বলিয়া মনে হয় তাহা প্রকৃতপক্ষে আসে শ্রমিক শোষণের ফলে, ইহা শ্রমিকের পরিশ্রমে উপাদিত নূতন মূল্যের একটি অংশযতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ ভাড়া করা শ্রমিক (মজুর) হিসাবে অন্যের পুঁজির সাহায্যে কাজ করিতে বাধ্য হইবে, যতক্ষণ পর্যন্ত এইরূপ মজুরি-প্রথা বিদ্যমান থাকিবে যে, একজন শ্রমিকের শ্রমশক্তি পণ্য হিসাবে মজুরির বিনিময়ে ক্রয়-বিক্রয় হইবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত কাহারও পক্ষে পুঁজির মালিকানার অধিকার বলে অন্যের শ্রমে সৃষ্ট মূল্যের একটা অংশ (বাড়তি মূল্য) মুনাফা হিসাবে ভোগ (শোষণ) করিবার অধিকার থাকিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মজুরি যাহাই বাড়ক না কেন, শোষণের হাত হইতে পরিপূর্ণ নিস্কৃতি মিলিবে নাএই জন্যই কার্ল মার্কস শ্রমশক্তি ক্রয়-বিক্রয়ের এই মজুরি প্রথাকে মজুরি-দাসত্ববলিয়া আখ্যা দিয়াছেনশ্রমিক শ্রেণী যখন উপাদন উপায়গুলির (বর্তমানের পুঁজি) মালিক হইবে তখনই মাত্র তাহার মজুরি দাসত্ব ঘুচিবেতখন আর মজুরি প্রথা থাকিবে না, কেহ মজুর থাকিবে না; তখন আর শ্রমিক তাহার শ্রমশক্তি পণ্য হিসাবে ক্রয় করিবে নাতখন শ্রমিক যাহা কিছু মূল্য সৃষ্টি করিবে, যাহা কিছু উপাদন করিবে তাহার সব কিছুরই মালিক হইবে সে নিজে, শুধু অংশ বিশেষের মালিক নয়এই উপাদন তখন সম্পূর্ণটাই শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থে, সমগ্র সমাজের সুখ, সমৃদ্ধি ও শক্তি কাজে ব্যবহৃত হইবেব্যক্তিগত মালিকানা উখাত করিয়া ঐগুলিকে সমাজ সম্পত্তিতে পরিণত না করা পর্যন্ত মজুরি-দাসত্ব ঘুচিবে না, শ্রমিকশ্রেণীর পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও মুক্তি প্রতিষ্ঠিত হইবে না

কেহ কেহ হয়ত বলিতে পারেন যে, শ্রমিক পরিশ্রম করিয়া যে মূল্য সৃষ্টি করে তাহার সম্পূর্ণটাই সে মজুরি বাবদ পায়, মালিক যে মুনাফা নেয় তাহা মাল বিক্রয় করিবার সময় বাজারে সৃষ্ট হয়, কৌশলে ক্রেতাদের নিকট হইতে ইহা আদায় করা হয়সহজ কথায় ক্রেতাদিগকে ঠকাইয়া পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চাইতে বেশী মূল্য নেওয়া হয়এই যুক্তি স্বীকার করিবার অর্থ দাঁড়ায় এই যে সমস্ত ক্রেতারাই প্রতারিত হইতেছে এবং সমস্ত বিক্রেতারাই জুয়াচুরি করিতেছেপণ্যের প্রকৃত মূল্যের চাইতে অধিকতর মূল্যে তাহা বিক্রয় করিতেছেএ কথা সত্য যে বর্তমানে একচেটিয়া পুঁজির দৌলতে ক্রেতারা পণ্যের ন্যায্য মূল্যে তাহা পায় না, একচেটিয়া পুঁজির নানা কারসাজির ফলে পণ্যের প্রকৃত মূল্যের (পণ্যদ্রব্যের মধ্যে যে পরিমাণ শ্রম রহিয়াছে তাহার অনুপাতে যে মূল্য ঠিক হয়) চাইতে অনেক অতিরিক্ত মূল্য ক্রেতাদিগকে দিতে হয়, ইহাই পুঁজিপতিদের অতিরিক্ত মুনাফাকিন্তু মুনাফা যদি মূলতঃ ক্রেতাদের ঠকাইয়া বাজারেই সৃষ্টি হইত তাহা হইলে দুনিয়ার মোট সম্পদ বৃদ্ধি পাইত না, যে সম্পদ (মূল্য) দুনিয়ায় আছে তাহার হাত বদল হইত মাত্রযদি সমাজে নূতন মূল্যই সৃষ্টি না হয় তাহা হইলে জাতীয় সম্পদের মূল্যও বাড়িতে পারে নাঅথচ আমরা দেখি উন্নয়নশীল জাতিসমূহের জাতীয় সম্পদ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছেইহা হইতেই বুঝা যায় যে সমাজে নূতন মূল্য সৃষ্টি হইতেছে এবং আমরা দেখিয়াছি যে এই মূল্য সৃষ্টি করিতেছে শ্রমিকশ্রেণী তাহার পরিশ্রম দ্বারাবাজারে ক্রেতাদের নিকট হইতে অতিরিক্তমুনাফা আদায়ের ফলে একজনার সম্পদ অন্যজনার হাতে যাইতেছে, সাধারণ মানুষের সম্পদ একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে চলিয়া যাইতেছে, অনুন্নত দেশগুলির সম্পদ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলিতে জমা হইতেছেইহা সত্যকিন্তু এ কথাও সত্য যে দুনিয়ার নূতন নূতন মূল্য, আরও সম্পদ প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হইতেছে; দুনিয়ার মোট সম্পদ ক্রমাগত বাড়িয়াই চলিয়াছেকল-কারখানায়, ক্ষেতখামারে মেহনতী মানুষরাই এই নূতন মূল্য সৃষ্টি করিতেছেআর মালিক শ্রেণী এই সম্পদেরই একটা বড় অংশ আত্মসা করিতেছে তাহাদের মুনাফা বাবদবাজারে নূতন মূল্য সৃষ্টি হয় না, মূল্যের হাত বদল হয় মাত্র

মালিক (ধনিক)- শ্রেণীর কি মুনাফা ভোগ করিবার কোনও ন্যায্য অধিকার নাই? ধনিকদের মধ্যে দুই চারিজন দেখা যায় যাহারা অশেষ চেষ্টা করিয়া যে-ধনসম্পতি জমা করিয়াছে তাহাই পুঁজি হিসাবে খাটাইয়া ক্রমে ধনী মালিক ইহয়াছে আবার ধনিক-সমাজে এমন লোকও বহু আছে যাহারা বহু কষ্টে উপার্জন করিতেছে এবং সেই কষ্টোপার্জিত অর্থের সামান্য কিছু হয়ত কোনও ব্যবসায়ে খাটাইয়া অতি অল্পই লাভ করিতেছেবহু কষ্ট করিয়া উপার্জন করিবার ফলে যে-ব্যক্তি কতকগুলি উপাদন শক্তির মালিক হইয়াছেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি উচ্ছেদ করিবার প্রশ্ন উঠিলে তাহারা আকাইয়া উঠিবেনঅথচ উপাদন-শক্তিগুলির উপর ব্যক্তিগত মালিকানা-স্বত্ব লোপ করিয়া তাহাকে সমাজ-সম্পত্তিতে পরিণত করিতে না পারিলে শ্রেণী শোষণ বন্ধ হইবে না, জনগণের দুঃখ দৈন্যের শেষ হইবে নাপ্রকৃতপক্ষে মালিকদের কষ্টোপার্জিত ধন-সম্পত্তির উপর ভিত্তি করিয়া ধনিক ব্যবস্থা ও সমাজ গড়িয়া উঠে নাইঅন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, জুলুমবাজি এবং জনগণকে তাহাদের সম্পত্তি হইতে জোর করিয়া উচ্ছেদ-সাধনের ভিতর দিয়াই ধনিক প্রথার সূচনা বলা চলেজোর জুলুম করিয়া ভারতবর্ষ ও অন্যান্য জায়গা হইতে ধনরতœ লুণ্ঠন করিয়া এবং দেশের জনসাধারণকে (চাষী প্রভৃতি) জোর করিয়া সম্পত্তি হইতে উচ্ছেদ করিয়া ইংল্যাণ্ডের ধনিকরা তাহাদের সমাজের পত্তন করেযে সকল ধনরতœ তাহার লুণ্ঠন করিয়া নিল তাহাই হইল তাহাদের গোড়ার পুঁজি এবং জনসাধারণকে জমিজমি হইতে উচ্ছেদ করিবার ফলে পাইল তাহারা সর্বহারা শ্রমিকইহারা মালিকদের যে-কোন শর্তে তাহাদের কল-কারখানার কাজ করিতে বাধ্য, সম্পত্তি হইতে উচ্ছেদ হইবার ফলে তাহাদের আর অন্যভাবে জীবন যাপন করিবার উপায় নাইসম্পত্তি হইতে উখাত হইয়া স্বাধীন জনগণ যাহারা স্ব স্ব ব্যবস্থা দ্বারা স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিত তাহারা কুলী মজুরে পরিণত হইলধনিক প্রথা ক্রমে ইংল্যাণ্ড হইতে অন্যান্য জায়গায় ছড়াইয়া পড়ে এবং সকল দেশেই ধনিক প্রথার সূচনাতে এই রকম জোর জুলুম, সাধারণকে সম্পত্তি হইতে উচ্ছেদ, প্রভৃতি দেখা যায়আজ ধনিক প্রথা প্রতিষ্ঠিত হইবার ফলে সাধারণ গরীব লোকও হয়ত সময়ে দুই দশ টাকা খাটাইয়া থাকে, কিন্তু যে-সমাজ প্রতিষ্ঠিত হইবার ফলে সে এই সুযোগ পাইতেছে তাহার গোড়াতেই গলদ, তাহা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে অন্যায় জোর-জুলুমের উপর ভিত্তি করিয়া এবং ধনিক দেশগুলির জনসাধারণের অভিজ্ঞতা হইতে ইহা স্পষ্টই বলা চলে যে, নেহাত জোর-জুলুমের উপরই এই সমাজ দাঁড়াইয়া আছে; নতুবা নিপীড়িত জনগণ এক মুহূর্তের জন্যও এই সমাজ বরদাস্ত করিত নাপ্রকৃতপক্ষে যাহার কষ্ট করিয়া উপার্জন করিয়া দুই দশ টাকা পুঁজি খাটায় তাহারা নামেই পুঁজির মালিক, বর্তমান ধনিক-সমাজে তাহাদের কোন মূল্যই নাইতাহারাও এই সমাজে নানাভাবে শোষিত, নিপীড়িতবাস্তবিকপক্ষে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করিবার জন্যই ধনিকশ্রেণী এদের স্বার্থের কথা তোলেআদতে ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এদের স্বার্থ রক্ষিত না হইয়া এরাও বরং গুঁড়াইয়া যাইতেছে এবং অনেকেই সর্বহারায় পরিণত হইতেছে

 

মালিকদের লাভ করিবার কোনও অধিকার আছে কিনা এই সম্বন্ধে আর একটা উদাহরণ লইয়া আলোচনা করিবভারতের বিহার অঞ্চলে জমিদারদের বাড়িতে কিছুকাল আগেও নাকি এমন চাকর দেখা যাইত যাহার পিতা, পিাতমহ এমনকি হয়ত প্রপিতামহ উক্ত জমিদারের বা তাহার কোন পূর্বপুরুষের নিকট এই চুক্তিতে কিছু টাকা (সামান্য দুই এক টাকা মাত্র) ধার করিয়াছিল যে, যতদিন সে টাকা পরিশোধ করিতে না পারিবে ততদিন সে ও তার বংশধর জমিদার বাড়িতে কাজ করিবেকিন্তু এই পর্যন্ত আর সেই দেনা পরিশোধ করা হইয়া উঠে নাইসারাদিন জমিদার বাড়ী বেগার খাটিয়া ধার শোধ করিবার মত অর্থ সে উপার্জন করিবে কি ভাবে? তাই বংশ পরম্পরায় জমিদারের চাকর রহিয়া গিয়াছেএই ধারও কখনও পরিশোধ করা হইয়া উঠে না, আর এই বংশানুক্রমিক দাসবৃত্তিও ঘুচে নাযদি কখনও কোন চাকর কোনও ক্রমে টাকা পরিশোধ করিবার জন্য জমিদারের নিকট টাকা দিত, তখন জমিদার তাহাকে চুরি করিবার অপরাধে পুলিসে দিতপ্রকৃতপক্ষে চুরি না করিলে সে টাকা পাবেই বা কোথায়? আজকাল এমন ঘটনা আমাদের নিকট বিস্ময়কর মনে হয়, কিন্তু ধনিক সমাজের মজুরদের অবস্থা ঠিক এমনই নয় কি? কোন একজন বা কয়েকজন পুঁজিপতি হয়ত কয়েক লক্ষ টাকা পুঁজি লইয়া এক কারবার শুরু করিল, কল-কারখানা প্রভৃতি বসাইয়া মজুর নিয়োগ করিলপ্রতি বসরই এই কারখানায় লাভ হইতেছে এবং এইভাবে লাভের পরিমাণ মূল পুঁজিকে বহুগুণে ছাড়াইয়া গিয়াছেতবু বহু বসর যাব সেই পুঁজিপতি ধনিকই কারখানার মালিক এবং সে বংশানুক্রমে মজুরকে শোষণ করিয়া চলিতেছেযদি কেহ কখনও ইহার বিরোধিতা করে তাহা হইলে সেই জমিদারের চাকরের মত তাহাকে পুলিসের হাতে পড়িতে হইবেআর সকলের চাইতে আশ্চর্য এই যে, চাকরের উপর জমিদারের এরূপ ব্যবহার বর্তমানে সকল লোকের নিকট অন্যায় জুলুম বলিয়া মনে হয়, কিন্তু আজিকার দিনে ধনিকদের হাতেই শাসন-যন্ত্র বলিয়া ধনিকদের এইভাবে লাভ করাটা কেহ বড় অন্যায় মনে করে না। (ঠিক যেমন সামন্ততান্ত্রিক যুগে ঐভাবে চাকর রাখাও খুব কম লোকই অন্যায় মনে করিত)অনেক চা-বাগান বা চট-কলের মালিক তাহাদের মূল পুঁজির শতগুণ পরিমাণ লাভ করিয়াছেতাই বলিয়া যদি সেই চা-বাগান বা চট-কলের কুলিরা’ (শ্রমিকগণ) দাবী করিয়া বসে যে এখন আর বাগান বা কলগুলির উপর মালিকদের কোন অধিকার নাই, তাহাদের পাওনা চুকাইয়া দেওয়া হইয়াছে, এইগুলি এখন ন্যায়তঃ কুলিদেরইসম্পত্তি তাহা হইলে অনেকেই হাসিয়া উড়াইয়া দিবেঅথচ আমরা দেখিলাম প্রকৃতপক্ষে ইহাই সত্যসুদখোর মহাজনের চক্রবৃদ্ধিহারে শতকরা তিনশত টাকা সুদ নেওয়া যত বড় সামাজিক অন্যায়, ধনিক সমাজে মুনাফাটা তাহার চাইতে কোনক্রমেই ভাল নয়খাতক তবু আশা করিতে পারে যে একদিন এই সুদ সে পরিশোধ করিতে পারিবে, অন্ততঃ আইনতঃ তাহার এই অধিকার আছে (যদিও কার্যতঃ খুব কম ক্ষেত্রেই ইহা সম্ভবপর হয়), কিন্তু ধনিক সমাজে শ্রমিকশ্রেণীর সেইরূপ কোন আইনানুগ অধিকারও নাই যে মালিকে (কল-কারখানা প্রভৃতি পুঁজি বাবদ) দেনা পরিশোধ করিয়া শ্রমিকশ্রেণীই সমস্ত উপাদনের উপায়গুলির মালিক হইবে

কাজেই, আমরা নিঃসংশয়ে বলিতে পারি যে প্রকৃতপক্ষে অন্যকে শোষণ করিয়া লাভ করিবার কাহারও ন্যায়সঙ্গত অধিকার নাই এবং উপাদনের উপায়গুলিতে ব্যক্তিগত অধিকারের বিলোপ সাধন করিয়া ব্যক্তিগত সম্পত্তি উচ্ছেদ করিয়া সামাজিক সম্পত্তি প্রতিষ্ঠিত করা সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্তযুক্তিগুলি সংক্ষেপে এইÑপ্রথমত ধনিক-প্রথা নি®প্রয়োজন এবং প্রতিক্রিয়াশীলধনিক প্রথা লুপ্ত হইলেও সমাজ স্বচ্ছন্দে চলিতে পারেবর্তমানে ধনিক-প্রথা সর্ব বিষয়েই সকল রকম প্রগতি ও উন্নতির পরিপন্থীদ্বিতীয়তঃ দুনিয়ার জনগণের দুঃখ দারিদ্র দূর করিতে হইলে, সমাজকে ধ্বংসের হাত হইতে রক্ষা করিতে হইলে ধনিক-প্রথা ধ্বংস করিয়া, পাদনের উপায়গুলির উপর ব্যক্তিগত অধিকার লুপ্ত করিয়া সমাজতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা ভিন্ন, সমস্ত উপাদনের উপায়গুলিকে সমাজ-সম্পত্তিতে পরিণত করা ভিন্ন কোন গত্যন্তর নাইতৃতীয়তঃ ধনিক-প্রথা অন্যায় ও জোর জুলুমের উপর প্রতিষ্ঠিতবহুকে বঞ্চিত করিয়া ইহা মুষ্টিয়ে পুঁজিপতিদের পুঁজি যোগাইয়াছেস্বাধীন জনগণকে সম্পত্তি হইতে উখাত করিয়া ইহা তাহাদিগকে ধনিক-প্রথার উপযোগী করিয়া তুলিয়াছে, অর্থা জনগণকে সর্বহারা দিন-মজুরে পরিণত করিয়াছেএবং বর্তমান সময়েও ইহা জোর জুলুমের উপরই দাঁড়াইয়া আছেজনগণকে সম্পত্তি হইতে উখাত করিয়াই ধনিক-প্রথা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে এবং ক্রমেই অধিকতর লোককে নিঃস্ব সর্বহারায় পরিণত করিয়া ইহা টিকিয়া থাকিতেছেধনিক-প্রথা অল্প লোকের জন্য বহুকে সম্পত্তি হইতে উচ্ছেদ করিয়াছেসমাজতন্ত্র অনেকের জন্য অল্প কয়েকজনকে (যে কয়েকজন সমস্ত উপাদনের উপায়গুলিকে তাহাদের কয়েকজনের একচেটিয়া ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করিয়াছে) ব্যক্তিগত সম্পত্তি হইতে উচ্ছেদ করিবে এবং ব্যাপক জনগণকে প্রয়োজন অনুযায়ী নিজস্ব সম্পত্তি ভোগ করিবার অধিকার ও সুযোগ দিবে

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.