সাম্যবাদী সমাজ: অনিল মুখাজী

কালক্রমে এই উপাদন এত বৃদ্ধি পাইবে যে তখন সমুদয় দ্রব্যসামগ্রীই যাহার যেইমত দরকার সেইমত ব্যবহার করিতে পারিবেমানুষের ভোগের জিনিসের পরিমাণ ক্রমেই বাড়িবে এবং অবশেষে এমন সময় আসিবে যখন সমাজে কোন জিনিসেরই অভাব থাকিবে নাএইরূপ যখন অবস্থা দাঁড়াইবে তখন দ্রব্যসম্ভার বিতরণ সম্পর্কে কাজের গুরুত্ব ও পরিমাণ অনুযায়ী বণ্টনের সমাজতান্ত্রিক নিয়ম প্রচলিত রাখিবার কোনও দরকার থাকিবে নাএই সময়ে সমাজের বণ্টনব্যবস্থা হইবে এইরূপ সকলেই তাহার ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করিবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রব্যসামগ্রী ভোগ করিবেএই ব্যবস্থাকেই বলা হয় সাম্যবাদ বা কমিউনিজমতবে, সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রথম অবস্থায় বণ্টন ব্যবস্থা এইরূপ হওয়া অসম্ভবকেননা, তখন সকলের সমস্ত রকম প্রয়োজন মিটাইবার মত যথেষ্ট পরিমাণ দ্রব্যসম্ভার উপাদন করা সম্ভবপর হইবে নাদ্বিতীয়তঃ বহুদিনব্যাপী সামাজিক শিক্ষার ভিতর দিয়া সামাজিক মনোবৃত্তি গড়িয়া না উঠার ফলে যাহার যেমন সামর্থ্য সেইমত কাজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগের ব্যবস্থা হইলে ধনিক-সমাজ-সুলভ মনোবৃত্তির ফলে প্রায় সকলেই কাজে ফাঁকি দিতে শুরু করিবেসমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিতর দিয়া সমাজ অনেক দিন অগ্রসর হইলে পরেই সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা আসিতে পারেসকলেই প্রয়োজন মত সব কিছু পাইবে বলিয়া কাহারও মনে কোন অসন্তোষ থাকিবে না এবং সন্তুষ্টি ও সামাজিক শিক্ষার ফলে কেহ কাজে ফাঁকি দিবে নাঅবশ্য, সমাজতান্ত্রিক অবস্থা অতিক্রম করিয়া সাম্যবাদী ব্যবস্থা আসিতে বহুদিন চলিয়া যাইবে এবং পৃথিবীর অন্ততঃ প্রধান প্রধান দেশগুলিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হইলে কোন একটা দেশে পরিপূর্ণ সাম্যবাদ আসিতে পারে নাতবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ যতই অগ্রসর হইবে উপাদন ততই বাড়িবে এবং মানুষের অভাব অভিযোগ ততই কমিয়া আসিতে থাকিবে; ক্রমে সমাজতান্ত্রিক সমাজে প্রয়োজনীয় সাধারণ দ্রব্যসম্ভারগুলির কাহারও অভাব থাকিবে নাসকলেই এইগুলি প্রয়োজন মত ভোগ করিবার সুযোগ পাইবেপূর্ণ সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হইতে অনেক সময় লাগিলেও সমাজতন্ত্রের উল্লিখিত-রূপ উন্নত স্তরে পৌঁছাইতে খুব বেশী দিন লাগিবে নাসাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র ক্রমেই অপ্রয়োজনীয় হইয়া পড়িবেরাষ্ট্রের বিশেষ কাজ থাকিবে না এবং অবশেষে লুপ্ত হইয়া যাইবেআমরা পূর্বেই দেখিয়াছি যে প্রতিপত্তিশীল শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা বজায় রাখিবার জন্য রাষ্ট্র অন্যান্য শ্রেণীকে শাসন করিবার একটি নির্যাতন যন্ত্র মাত্রকাজেই, সমাজে যখন কোনও শোষণ থাকিবে না, শ্রেণী বিভেদ যখন লোপ পাইবে, যখন সকলেই সমাজের প্রয়োজনে পরিশ্রম করিবে, সকলেই হইবে শ্রমজীবী, তখন সকেলেই প্রয়োজন মত ভোগ করিতে পাইবেযখন সমাজতান্ত্রিক শিক্ষা-দীক্ষার ফলে পরিশ্রম করা হইবে সম্মানের, যখন সমাজের জন্য যে যত বেশী পরিশ্রম করিবে তাহারাই তত বেশী সমাদর, শিক্ষা-দীক্ষা, রীতি-নীতি, সাহিত্য-বিজ্ঞান-দর্শন, শিল্পকলা প্রভৃতি সব কিছুর ভিতর দিয়াই যখন সাম্যবাদের সৃজনশীল শ্রমের মহান আদর্শ প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত হইবে, তখন মানুষ কাজে আনন্দ পাইবে, কাজ করিতে ভালবাসিবেতখন কাহারও মনে ফাঁকি দিবার প্রবৃত্তি জাগিবে না আর যদি কেহ কাজে ফাঁকি দেয়ই তাহা হইলে সে সমস্ত সমাজের নিকট হেয় প্রতিপন্ন হইবেঅসামাজিক (সমাজ-বিরোধী) অকর্মণ্য লোককে তখন সকলে ঘৃনার চক্ষুতে দেখিবেশ্রমজীবী মানুষের স্বার্থানুকূল সমাজের বিধান ও রীতিনীতি সমূহ তখন সকলেই নিজ নিজ শিক্ষাগুণে অলঙ্ঘনীয় বলিয়া মনে করিবেতখন সমাজের সকলের মঙ্গলের জন্য তৈয়ারী এই সকল সামাজিক নিয়ম শৃঙ্খলা যদি কেহ লঙ্ঘন করে তাহা হইলে জনগণের মতের প্রবল চাপই তাহাকে সংশোধন করিবার পক্ষে যথেষ্ট হইবেএক কথায় সমাজতান্ত্রিক-সমাজব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাপক মানুষ যখন হইবে মহ, তৃপ্ত এবং নূতন গড়ার আনন্দে উদ্দীপ্ত, তখন আর জুলুম চালাইবার জন্য কোনও যন্ত্রের প্রয়োজন হইবে নাআইন-কানুন, জোর-জুলুমের দরকার হয় তখনই যখন সামাজিক শিক্ষার অভাবেই হউক বা ব্যক্তিবিশেষ বা শ্রেণীবিশেষের পক্ষে ক্ষতিকর বলিয়াই হউক, সাধারণ লোক আপনা হইতেই কোনও বিধান মানিয়া চলিতে রাজী হয় নাকিন্তু যখন সমাজের সকল বিধানই হইবে জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য এবং সামাজিক শিক্ষার ফলে জনসাধারণ যখন এই কথাটা ভালভাবেই উপলব্ধি করিতে পারিবে, তখন আর আইন-কানুন, জোর-জুলুম চালাইবার মত পাত্র মিলিবে কোথায়? সমাজের সকলের মঙ্গলের জন্য যেভাবে চলার দরকার, শিক্ষাগুণে এবং সচেতন স্বার্থ চিন্তা হইতেও সকলে আপনা হইতেই সেইভাবে চলিবে বলিয়া এবং জোর-জুলুমের কোনও প্রয়োজন থাকিবে না বলিয়া সাম্যবাদী সমাজে রাষ্ট্রযন্ত্র ও তাহার সংলগ্ন যত প্রতিষ্ঠান আইন-কানুন, সিপাহী-শাস্ত্রী, ফৌজদারী, আদালত, জেল, ফাঁসী প্রভৃতি সব কিছুই অপ্রয়োজনীয় হইয়া পড়ায় এইগুলি ক্রমে লুপ্ত হইয়া যাইবেসাম্যবাদী সমাজে রাষ্ট্র ব্যবস্থা লোপ পাইবে, এই কথার অর্থ ইহা নয় যে সেখানে কোন বিধি বিধান থাকিবে না, সকলেই খামখেয়ালীভাবে চলিবেসাম্যবাদী সমাজে মানুষ এতদূর শিক্ষিত ও সচেতন থাকিবে যে সেখানে কোন বিধি বিধানের পিছনে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন থাকিবে না, মানুষ আপন আপন কর্তব্য সম্বন্ধে এতটা সজাগ এবং কর্তব্য সম্পাদনে এতটা আগ্রহশীল থাকিবে যে সামাজিক কার্যক্রমের জন্য রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হইবে নাতখন সমস্ত মানুষ হইবে সকলের সচেতন ইচ্ছায় সৃষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সভ্যসকলের সুবিধার জন্য বিধি-বিধানগুলি তাহারা সকলে স্থির করিবে এবং সকলেই এইগুলি কর্তব্যজ্ঞানে প্রতিপালন করিবেসাম্যবাদী সমাজের নিয়ম শৃঙ্খলাগুলি হইবে একটি সমিতির নিয়ম-শৃঙ্খলার মতসকলের উদ্দেশ্যের ঐক্য এবং সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করিবার দায়িত্ব সম্বন্ধে সকলের সচেতনতাই হইবে সাম্যবাদী সমাজের নিয়ম শৃঙ্খলার পিছনের শক্তি

নৈরাজ্যবাদী (এনার্কিস্ট) নামে একটি মতাবলম্বী লোক আছেন যাঁহারা মনে করেন যে ধনিকতন্ত্র ধ্বংস করিবার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের উচ্ছেদ করিয়া সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবেতাহাদের মতে, রাষ্ট্রই সমস্ত অনর্থ ও অত্যাচারের কারণকাজেই রাষ্ট্র এক মুহূর্তও বরদাস্ত করা ঠিক নয়তাঁহাদের ধারণা, রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করিলেই সমস্ত রকমের অন্যায় অবিচার লোপ পাইবেকিন্তু নৈরাজ্যবাদীগণ কল্পনাবিলাসী মাত্রধনিকতন্ত্র ধ্বংস হইবার সঙ্গে সঙ্গে ধনিক সমাজের প্রভাব, ঐ সমাজের ভাবধারা একেবারে লুপ্ত হইবে নাধনিক-সমাজের ধ্বংসাবশেষ বেশ কিছুকাল থাকিয়া যাইবেএমন অবস্থায় রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্ছেদ করা হইলে ধনিক-সমাজ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইবার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকিয়া যাইবে এবং সাম্যবাদী-সমাজ প্রতিষ্ঠিত করা কোনও দিনও হইয়া উঠিবে নাসমাজতন্ত্র (সোস্যালিজম) হইতেছে ধনতন্ত্র (ক্যাপিটালিজম) এবং সাম্যবাদের (কমিউনিজম) মধ্যে সমাজ বিকাশের একটি    স্তরধনিক ব্যবস্থা হইতে সাম্যবাদে পৌঁছাইতে হইলে এই সোপান পার হইয়া যাইতে হইবেসমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ ধনতন্ত্রের ধ্বংসাবশেষ লুপ্ত করিয়া জনসাধারণকে সাম্যবাদী শিক্ষা ও ভাবধারায় দীক্ষিত করা এবং পর্যাপ্ত উপাদন করিয়া সাম্যবাদের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সৃষ্টি করাসাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে কিছু কিছু জোর-জুলুম চালাইতে হইবে সেই সকল লোকের উপর যাহারা ধনিক সমাজের সমর্থক, যাহারা সাম্যবাদী-সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে বাঁধা সৃষ্টি করিবেসমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রকে যন্ত্ররূপে ব্যবহার করিতে হইবে সাম্যবাদী-সমাজ প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য, এমন আদর্শ সমাজ সৃষ্টি করিবার জন্য যেখানে আর রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন থাকিবে নাযাঁহারা রাষ্ট্র ব্যবস্থা উচ্ছেদ করিয়া একবারেই ধনতন্ত্র হইতে সাম্যবাদে লাফ দিবার চেষ্টা করিবেন তাঁহাদের  মনোভাব যতই মহ হউক না কেন, তাঁহারা কার্যতঃ ধনিক ব্যবস্থাকে বাঁচাইয়া রাখিতেই সাহায্য করিবেন

সমাজতন্ত্র কথাটার আজকাল বড়ই কদর্থ হইতেছেপথে ঘাটে ইহা এখন প্রায় যে-কোনও অর্থেই ব্যবহৃত হয়সমাজের দশজনের প্রয়োজনে যে কোন কাজকেই এখন অনেকে সমাজতন্ত্র বলিয়া চালাইয়া দেনএইজন্য সমাজতন্ত্র কথাটা ব্যবহার করা বিপজ্জনক হইয়া দাঁড়াইয়াছেপ্রকৃত সমাজতন্ত্রীদের এই সম্বন্ধে সতর্ক থাকা উচিততাঁহারা যেন শুধু নামের ফাঁকিতে না পড়েনপূর্বে সাম্যবাদীগণ নিজেদের অনেক সময়ই সমাজতন্ত্রী বলিয়া আখ্যা দিতেনকেননা সমাজতন্ত্র সাম্যবাদের পৌঁছাইবার একটি স্তর বা সোপানসমাজতন্ত্রের ভিতর দিয়া না গেলে সাম্যবাদে পৌঁছান অসম্ভবসমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করিবেকাজেই, সমাজতন্ত্রীদিগকে সাম্যবাদী ভিন্ন অন্য কোন মতাবলম্বী বলিয়া ভুল করিবার কোনও সঙ্গত কারণ ছিল নাকিন্তু পরের যুগে নানা-জাতীয় সুবিধাবাদীদের অপপ্রয়োগে সমাজতন্ত্রশব্দটি ব্যবহার করা বিপজ্জনক হইয়া দাঁড়াইল বলিয়া সাম্যবাদীগণ নিজেদের কমিউনিস্ট বা সাম্যবাদী বলিয়া অভিহিত করেন এবং লেনিন সাম্যবাদীদের আন্তর্জাতিক সঙ্ঘের নামকরণ করিলেন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালবা সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সঙ্ঘলেনিন শ্রমিক শ্রেণীর পার্টিকে সমাজতন্ত্রী পার্টি না বলিয়া সাম্যবাদী পার্টি বলিলেন কেন সেই সম্বন্ধে যুক্তি দেখাইয়া বলিয়াছেন, ‘যদিও মানবসমাজ ধনতন্ত্রের পর সমাজতন্ত্রেই পৌঁছাইবে, তব্ওু আমাদের পার্টির উদ্দেশ্য আরও অগ্রসর হওয়া এবং প্রকৃতপক্ষে সাম্যবাদই সমাজতন্ত্রের বাস্তব পরিণতি

রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র (স্টেট সোস্যলিজম) নামে একটি কথা এখন বহুল প্রচারিতযে রাষ্ট্রে বিশিষ্ট উপাদনের উপায়গুলির, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির মালিকানা স্বত্ব রাষ্ট্রের হাতে সেখানে রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র প্রচলিত বলা হয়কোনও একটি রাষ্ট্র হয়তো ডাকবিভাগ, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, রেলওয়ে, স্টীমার প্রভৃতি যোগাযোগ ও যানবাহন বিভাগ, খনি, লোহালক্কড়, অস্ত্রশস্ত্রের কারখানা প্রভৃতি পরিচালিত করেএক্ষেত্রে বলা হয় যে, উক্ত রাষ্ট্রে রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছেকিন্তু আমরা যেন রাষ্ট্রিক-সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে এক অর্থ জ্ঞাপক মনে করিয়া না বসিসমস্ত কিছু উপাদনের উপায়গুলির মালিক যদি রাষ্ট্র হয়, শুধু তাহা হইলেই রাষ্ট্রকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা চলে নাদেখিতে হইবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোন্ শ্রেণীর হাতে, রাষ্ট্র পরিচালনা করে কাহারা? এবং কোন্ শ্রেণীর স্বার্থে এই রাষ্ট্রায়ত্তকরণ হইয়াছে? অনেক ক্ষেত্রে একচেটিয়া মালিকরা কম পুঁজি খাটাইয়া বেশী মুনাফা করিতে পারে, রাষ্ট্রের পুঁজি (তথা জনসাধারনের অর্থ) খাটাইয়া যাহাতে তাহাদের সুবিধার্থে কতগুলি শিল্প পরিচালিত হয় সে জন্য ধনিক রাষ্ট্রও অনেক শিল্প রাষ্ট্রয়াত্ত করেরাষ্ট্র যদি ধনিক-শ্রেণীর হাতে থাকে, তাহা হইলে সেখানে রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইলেও অর্থা সমস্ত উপাদনের উপায়গুলি রাষ্ট্রের আয়ত্তাধীন থাকিলেও প্রকৃতপক্ষে উপাদনের উপায়গুলির ধনিকশ্রেণীরই থাকিয়া গেল, উহা ধনিকের স্বার্থে ব্যবহৃত হইবেরাষ্ট্রযন্ত্র যতক্ষণ না শ্রমজীবীদের হাতে আসিতেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত উহার যতকিছু ব্যবস্থা, তাহা মূলতঃ ধনিকেরই সুবিধার জন্য এবং সকল ব্যবস্থাই ধনিক প্রথার অন্তর্গত হইবেপ্রকৃতপক্ষে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রগুলির অবস্থা অনেকটা এইরূপরাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র একটি ভুয়া কথা, ইহা জনসাধারণকে ধাপ্পা দিবার জন্য ব্যবহৃত হয়; ইহাকে রাষ্ট্রিক-ধনতন্ত্র (স্টেট ক্যাপিটালিজম্) বলিলেই ঠিক হইতসমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্রকেই বলা হয়, যে রাষ্ট্র শুধু সমাজের উপাদনের উপায়গুলির মালিক নয়, যে-রাষ্ট্র পরিচালনা করে সমাজের সমস্ত শ্রমজীবীগণ তাহাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য

ধনিক-সমাজে কাজ করিবার, উন্নতি ও সৃষ্টি করিবার প্রেরণা যোগায় ব্যক্তিগত মুনাফা ভোগ করিবার আশা ও সম্ভাবনাসমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী সমাজে ব্যক্তিগত মুনাফা ভোগ করিবার কোনও সম্ভাবনা নাইসেখানে কর্মপ্রেরণা যোগাইবে কিসে? এই প্রশ্ন স্বভাবতঃই আমাদের মনে জাগেঅর্থ জমা করিবার কিংবা অন্যকে শোষণ করিবার প্রবৃত্তি মানুষের জন্মগত নয়বহুদিন যাব শোষণ-প্রথা চলিয়া আসার ফলেই মানুষের এই প্রবৃত্তি গড়িয়া উঠিয়াছেবসিয়া বসিয়া খাইবার ইচ্ছা এবং ভবিষ্য সম্বন্ধে অনিশ্চয়তা-বার্ধক্য, রোগ-শোক, ছেলে-মেয়ের ভবিষ্য সম্বন্ধে চিন্তা এইগুলিই মানুষকে অর্থগৃধ শোষক করিয়া তুলিয়াছেযে-সমাজে বসিয়া বসিয়া খাওয়া শুধু আইন বিরুদ্ধই নয়, নূতন ভাবধারা প্রচারের ফলে সমাজের সকলের চক্ষুতে ঘৃন্য এবং অপমানজনকও বটে এবং যে-সমাজে ভবিষ্য সম্বন্ধে কোন অনিশ্চয়তা নাই, সমাজই সকলের ভবিষ্য সম্বন্ধে দায়িত্ব গ্রহণ করিতেছে এবং সেই দায়িত্ব খুব ভালভাবেই পালন করে বার্ধক্য, রোগ-শোক, ছেলে-মেয়ের সুশিক্ষা ও সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্বন্ধে কোনও দুর্ভাবনা ভাবিতে হয় না সেই সমাজে শোষণ করিবার প্রবৃত্তিও ক্রমে লোপ পাইবেকেহ পরিশ্রম করিলে, উন্নতি করিলে, নূতন কিছু সৃষ্টি করিলে সমাজে সকলের সুখ-সমৃদ্ধি বাড়িবে, সঙ্গে সঙ্গে নিজেরও সুখ-সম্ভোগ, সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়া যাইবে এই সামাজিক চেতনা ও দায়িত্ববোধই মানুষকে করিয়া তুলিবে অক্লান্তকর্মীসমস্ত সমাজ ও জনগণ কর্তৃক পুরস্কৃত হইবার, সম্মানিত হইবার, আদর পাইবার প্রবল আশা-আকাক্সক্ষাও মানুষের জীবনকে কর্মময় এবং নূতন সৃষ্টি করিবার আগ্রহে আকুল করিয়া তুলিবেবস্তুতঃ যাহারা ধনিক সমাজে শিল্পকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান প্রভৃতি সৃষ্টি করে, তাহাদের কত সামান্যই বা সুযোগ-সুবিধা, আর কতটুকুই বা আদরকিন্তু সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদী সমাজে সমস্ত সমাজ হইবে তাঁহাদের সমঝদার, তাঁহারা হইবেন সকলের সম্মানীয়সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে নজর দিলেই আমরা এই কথার সার্থকতা বুঝিতে পারিএই কারণেই সমাজতান্ত্রিক সমাজে মানুষ শ্রমকে পছন্দ করিবে, ভালবাসিবে, শ্রম হইবে আনন্দের বস্তু

একটা প্রশ্ন উঠিতে পারেসমাজতান্ত্রিক সমাজে সকলে সমানভাবে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা পাইবেফলে, সকল লোকই যখন উন্নত এবং কোনও না কোন প্রয়োজনীয় শিক্ষায় পারদর্শী হইয়া উঠিবে, তখন নিকৃষ্ট এবং ঘৃন্য কাজগুলি করিতে রাজী হইবে কাহারা? আর সমাজতান্ত্রিক সমাজে যদিও-বা অধিকতর উপার্জনের লোভে কেহ ঘৃন্য করিতে রাজী হয়, কিন্তু সাম্যবাদী সমাজে যখন সকলেই প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগের অধিকার পাইবে, তখন ঘৃন্য কাজ করিতে লোকে রাজী হইবে কেন? সমাজ সেবার মনোভাব হইতে কয়জন লোক আপনা-আপনি এইরূপ কাজ করিতে অগ্রসর হইবে?

বর্তমান যুগে বিজ্ঞানের যেরূপ উন্নতি হইয়াছে সেই দিকে একটু লক্ষ্য করিলেই আমরা উপরিউক্ত প্রশ্নের জবাব পাইতে পারিবিজ্ঞানের যে পর্যন্ত উন্নতি হইয়াছে তাহাতে পূর্ব যুগের অনেক ঘৃণ্য কাজই এখন আর ঘৃণ্য পর্যায়ে পড়ে না; যেমন মুচী, মেথর, ঝাড়দার, ভিস্তিওয়ালা, ধোপা প্রভৃতির কাজ এখন উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রথার সাহায্যে ভদ্রভাবেই করা চলেবাষ্পীয় শক্তি, বিদ্যু, উন্নত যন্ত্রপাতি প্রভৃতি আবিস্কৃত হইবার ফলে এখন এই সকল কাজ হইয়াছে নিপুণ কারিগর ও ভদ্র বিজ্ঞানীর কাজকয়লা তোলা, চাষ করা, মাটি কাটা, রান্না-বান্না করা, প্রভৃতি যে সকল কাজ অসম্ভব শারীরিক শ্রমসাধ্য ও নিকৃষ্ট ছিল, এখন বিজ্ঞান সেইগুলিকে দক্ষ শিল্পী ও যান্ত্রিকের কাজে পরিণত করিয়াছেকিন্তু ধনিক-সমাজে সমস্ত উপাদনের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত মুনাফা সৃষ্টি করা, সেই জন্য সেখানে এই সকল আবিস্কারের উপযুক্ত ব্যবহার হইতে পারে নাকেননা, এইগুলি ব্যবহার করিলে অনেক সময়েই খরচ বেশী পড়ে, ধনিকদের মুনাফা কম হয় এবং কোনও কোনও কাজে হয়তো মুনাফা থাকেই নাতাহা ছাড়া আর্থিক অনটনের জন্য সাধারণ লোক বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের সুযোগ-সুবিধা হইতে বঞ্চিত, ইহার সুযোগ গ্রহণ করা তাহাদের সামর্থ্যরে অতীতএই সকল কারণে ধনিক-সমাজে জনসাধারণের পক্ষে হিতকর ও কষ্ট লাঘবকারী যন্ত্রপাতি প্রভৃতি আবিস্কারের দিকে বিজ্ঞানীরাও বড় বিশেষ নজর দেন নাতাহাদের তো খাওয়ার যোগাড় করিতে হইবে! এইরূপ কাজ করিলে তাহাদের আদর করিবে কে? ইহার চাইতে বরং সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জন্য ধ্বংসকারী মারণাস্ত্র আবিস্কার অনেক বেশী লাভজনককিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমাজে যখন ব্যক্তিগত লাভের প্রশ্ন থাকিবে না, সমাজের সকলের ভোগের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী উপাদনই হইবে যখন সমাজের লক্ষ্য, তখন বিজ্ঞানীর আদর্শ এবং স্বার্থই হইবে জনহিতকর নূতন নূতন আবিস্কার করাফলে, এই জাতীয় আবিস্কারের সংখ্যা তখন সহস্রগুণ বৃদ্ধি পাইবে এবং বর্তমান যুগে যে সকল কাজ নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য উপায় ভিন্ন সমাধান চলে না, সেইগুলিও আর নিকৃষ্ট এবং ঘৃণ্য থাকিবে না

প্রকৃতপক্ষে যতক্ষণ না সমাজতান্ত্রিক সমাজে বিজ্ঞানের ক্রমাগত দ্রুত উন্নতির ফলে সমস্ত কাজই হইয়া পড়িতেছে আকর্ষণীয়, সহজ, সরল, ভদ্রোচিত এবং নিরাপদ যাহাতে সকল লোকই সহজে সকল কাজ শিখিতে ও ভালভাবে করিতে পারেÑততক্ষণ পর্যন্ত সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে নাসাম্যবাদ আসিবে বিজ্ঞানের চরম উকর্ষের ফলস্বরূপ

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.