বিপ্লবী জসিমউদ্দীন মণ্ডল

তাঁরা যখন পার্বতীপুরে ছিলেন তখন তাঁদের পাশের বাসায় থাকতেন তাঁর বাবার এক সহকর্মী বন্ধুতিনি ছিলেন স্বদেশীবাবার অনুরোধে একদিন তিনি তাঁকে পড়াতে শুরু করলেনকিন্তু পড়াশোনার দিকে জসীমউদ্দীন মণ্ডলের আদৌ কোনো মনোযোগ ছিলো নাতাঁর বাবার সেই বন্ধুটি তাঁকে পড়ানোর জন্য খুব চেষ্টা করতেনতবে পড়ার চাইতে তিনি তাঁর সেই শিক্ষকের কাছ থেকে স্বদেশীদের গল্প শুনতে বেশি পছন্দ করতেনতখন ব্রিটিশ রাজকে তাড়াবার জন্য তরুণরা হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্রতাঁদের সেই সব রোমাঞ্চকর কাহিনী তখন লোকের মুখে মুখেমাস্টারদা, বাঘা যতীন, প্রীতিলতা তখন কিংবদন্তির নায়ক-নায়িকাধুতির কোঁচায় পিস্তল গুজে রাখা, বোমাবাজি করা এসব ছিলো জসীমউদ্দীন মণ্ডলের কাছে সত্যিকারভাবেই রোমাঞ্চকর ঘটনাতাঁর কাছে শুনতেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে মাস্টারদার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথা, ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে প্রীতিলতা ও কল্পনার সাহসিকতার কথাসেসব কথা বলতে বলতে এক একদিন তাঁর শিক্ষকও উত্তেজিত হয়ে উঠতেনতাঁর চোখ দুটো অজানা আক্রোশে ধিকি-ধিকি জ্বলে উঠত

সেসব গল্প শুনতে শুনতে জসীমউদ্দীন মণ্ডলের মনে হতো, হায়, তাঁর কোমরেও যদি এমনি একটা পিস্তল থাকতো, তিনিও যদি স্বদেশী হতে পারতেন! এসব গল্প শোনার কারণে সেই ছেলেবেলাতেই স্বদেশীদের ওপর তাঁর মোহ জন্মে এবং ইংরেজদের প্রতি জন্মে ক্ষোভআর তাই তো ব্রিটিশদেরকে এদেশ থেকে তাড়ানোর জন্য, এদেশের মানুষকে তাঁদের অত্যাচার, নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং বিপ্লবী ও শ্রমিক নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন

জসীমউদ্দীন মণ্ডলের জন্ম হয়েছিলো এমন একটা পরিবারে, যেখানে জন্ম-তারিখ কিংবা জন্মসন ঘটা করে লিখে রাখবার কোনো রেওয়াজ ছিলো নাতাঁর মা বলতেন, "সেই যে দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ শুরু হলো, তার ঠিক দশ বছর পর তোর জন্ম।" তার থেকেই আন্দাজ করা যায়, ১৯১৪ সাল থেকে দশ বছর পরে অর্থাৎ ১৯২৪ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেনআজকের কুষ্টিয়া জেলা তখন অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিলএই নদীয়া জেলার কালীদাশপুর গ্রাম তাঁর জন্মস্থানতাঁর বাবার নাম হাউসউদ্দীন মণ্ডলছেলেবেলায় দাদীর মুখে শুনেছিলেন, দাদী আদর করে তাঁর প্রথম সন্তানের নাম রেখেছিলেন হাউস অর্থাৎ শখতাঁর বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন

সে সময় আজকের দিনের মতো এতো স্কুল ছিল নাগ্রামে তো প্রায় ছিলো না বললেই চলেদু'একটা মক্তব, পাঠশালা যাও-বা ছিলো, সেগুলোরও প্রায় টিম-টিমে অবস্থানানাবাড়ির গ্রামের এমনি একটা পাঠশালায় শুরু হয় তাঁর বিদ্যা অর্জনের কসরততবে বিদ্যা অর্জনের চাইতে বিদ্যা বিসর্জনের আয়োজনই ছিলো সেখানে বেশিপাঠশালার মাষ্টার মশাই তাঁদেরকে সেদিনকার মতো পাঠ ধরিয়ে দিয়ে নড়বড়ে টেবিলে খ্যাংরা কাঠির মতো পা দু'খানা তুলে আয়েশ করে সটান হতেনকিছুক্ষণের ভেতরেই শুরু হতো তাঁর নাকের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর গর্জনতাঁরা সেই অবসরে পিঠটান দিতেন আমবাগান মুখেকতোবার যে আম পাড়তে গিয়ে মাষ্টার মশাইয়ের বকুনি খেয়েছেন তার হিসেব নেই

১৯৩২ সালে তাঁর বাবা বদলি হয়ে এলেন সিরাজগঞ্জেএরপর তিনি বদলি হলেন রানাঘাটেসেখান থেকে পার্বতীপুরজসীমউদ্দীন মণ্ডলরাও বাবার সাথে সাথে চলে এলেন পার্বতীপুরমূলত তাঁর বাবার এই ঘন ঘন বদলির কারণে, তাঁর পড়াশোনা তেমন এগোতে পারেনিতবে দুনিয়াদারি সম্পর্কে তাঁর ধারণা হয়েছিলো বিস্তরএরপর তাঁর বাবা বদলি হয়ে এলেন ঈশ্বরদীঈশ্বরদীতে আফসার ছিলো তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু

এরপর একদিন তাঁর বাবা বদলি হলেন কলকাতায়তাঁর অনেকদিনের শখ পূরন হলো এবারএখন থেকে প্রাণভরে স্বদেশী দেখতে পারবেন ও স্বদেশীদের সাথে মিশতে পারবেনতাঁদের বাসা ছিল নারকেলডাঙা কলোনিতেকলোনিটি চারপাশে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিলপ্রাচীরের পাশ দিয়ে চলে গেছে বড় বাজারের রাস্তারাস্তার উপর নারকেলডাঙা ব্রিজসেই রাস্তা ধরে দুপুরের খর রোদে মিছিল করে চলে যেতো অগ্নিযুগের অগ্নিপুরুষরাআর মিছিলের পুরোভাগে দৃপ্ত পদভারে বুক চিতিয়ে হেঁটে যেতেন শ্রমিকের দলতখন সমস্ত কলকাতাই পরিণত হয়েছিলো যেনো মিছিলের নগরীতেইংরেজ খেদাবার জন্য সমস্ত শহরের মানুষ যেনো ক্ষীপ্ত হয়ে উঠেছেনারকেলডাঙা কলোনির তাঁরা ক'জন কিশোর প্রাচীরের ওপর বসে বসে দেখতেন সেইসব মিছিল আর পদযাত্রামিছিল থেকে "ইংরেজ বেনিয়া এদেশ ছাড়ো, ভারত মাতাকে মুক্ত কর", "লাল ঝাণ্ডা কি জয়", "ভারত মাতা কি জয়" ইত্যাদি শ্লোগান উঠতো

প্রতিদিন মিছিল দেখে দেখে আর শ্লোগান শুনে শুনে জসীমউদ্দীন মণ্ডল মনে মনে উৎসাহ বোধ করতেন মিছিলে যাবার জন্যমাঝে মাঝে মিছিলের লোকজনও তাঁদের ডাকতেন, "এই খোকারা চলে এসো আমাদের মিছিলে।" একদিন সত্যি সত্যি সম্মোহিতের মতো তাঁরা দল বেঁধে যোগ দিলেন লাল ঝাণ্ডার মিছিলেপ্ল্যাকার্ড তুলে নিলেন দৃঢ় দুই হাতেউঁচিয়ে ধরলেন লাল ঝাণ্ডাতারপর থেকে শুরু হলো নিয়মিত মিছিলে যোগ দেয়ার পালামনে মনে নিজেকে কল্পনা করতেন লাল ঝাণ্ডার একজন বলিষ্ঠ সৈনিক হিসেবেমিছিল ছুটতো ধর্মতলা আর বউ বাজার ঘুরে মনুমেন্টের দিকেমাঝে মাঝে থেমে চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে অনলবর্ষী বক্তৃতা দিতেন নেতারাসেসব বক্তৃতার কী তেজ! বুকের গভীরে ঢুকে রক্তে মাতম লাগিয়ে দিতো

মনুমেন্টের এই রকমের সভা-সমাবেশ শেষে বিলিতি কাপড় পোড়ানোর ধুম পড়ে যেতোতাঁরা যারা অল্প বয়সের, তাদেরকে বলা হতো বিলিতি কাপড় সংগ্রহ করে আনার জন্যকতোদিন তাঁরা আউটরাম ঘাটে স্নানরতা মহিলাদের বিলিতি কাপড় চুরি করে এনে নেতাদের হাতে তুলে দিয়েছেন! আস্তে আস্তে মিছিলে যোগ দেয়া, যেখানেই হোক জনসভা শুনতে যাওয়া তাঁর একটা নেশায় পরিণত হলোধর্মঘটের স্লোগান শুনলেই তাঁর বুকের মধ্যে আগুন ধরে যেত

১৯৪০ সালের মাঝামাঝিতে শিয়ালদহে মাসিক ১৫ টাকা মাইনেতে রেলের চাকরিতে যোগ দিলেন জসীমউদ্দীন মণ্ডলচাকরির পাশাপাশি ক্রমে ক্রমে লাল ঝাণ্ডার একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি বেশ পরিচিতি পেলেনএমন কি কমিউনিস্ট পার্টির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শেও এসে গেলেন একদিন১৯৪০ সালের শেষে এসে সদস্য হলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিরগর্বে সেদিন তাঁর বুক ভরে উঠেছিলো শোষিত মানুষের পার্টি, সর্বহারা শ্রেণীর সংগঠন, সেই পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য হয়েছেন তিনি

১৯৪১-৪২ সালের দিকে জসীমউদ্দীন মণ্ডলের প্রমোশন হলো সেকেন্ড ফায়ারম্যান হিসেবেইঞ্জিন চালনায় তাঁর এখন একটা মূখ্য ভূমিকা রয়েছেতাঁরা ইঞ্জিনে কয়লা না মারলে ইঞ্জিন চলবে নাবার্মায় ব্রিটিশের সাথে জাপানিদের প্রচণ্ড যুদ্ধের খবর কানে আসছেআর সেই খবরে কলকাতার মানুষগুলো আনন্দে আত্মহারাব্রিটিশদের বিপর্যয় লক্ষ করে ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষ উৎফুল্লঠিক হয়েছে! এতদিন ভারতের অসহায় মানুষের ওপর একতরফা গুঁতোনি চালিয়েছে বাবা ব্রিটিশ! এবার জাপানি গুঁতোনি কেমন লাগে, একটুখানি চেখে দেখো না কেনো বাছাধন!

তখন জাপানের নাম ভারতের প্রতিটি মানুষের অন্তরে গাঁথাআজাদ হিন্দু ফৌজের প্রতিষ্ঠা, নেতাজী সুভাষ বোস এবং বিপ্লবী মহানায়ক রাসবিহারী ঘোষের জার্মান ও জাপানিদের সাথে সমঝোতার ফলে জার্মান ও জাপানিদের ভারতের মানুষ আপন বলে ভাবতে শুরু করেছিলোআর কি না সেই জাপানের বিরুদ্ধেই বার্মায় যুদ্ধ চলছে! প্রচণ্ড যুদ্ধসেই যুদ্ধে ব্রিটিশদের অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদ তাঁরাই ট্রেনে করে পৌঁছে দিচ্ছেনআর সেটাই ব্যবহার করা হচ্ছে তাঁদেরই শুভাকাক্ষীদের বিরুদ্ধেনা, এ কিছুতেই হতে দেয়া যায় না!

তখন বোম্বে ও মাদ্রাজগামী সব ট্রেনই চিৎপুর হয়ে যেতোহরহামেশাই বার্মা রণাঙ্গনে ব্রিটিশের অস্ত্র বোঝাই ট্রেন চলাচল করছেএরই মধ্যে একদিন চিৎপুর স্টেশনের চায়ের দোকানে বসে তাঁরা ড্রাইভার ও ফায়ারম্যানের দল সিদ্ধান্ত নিলেন, কেউ ইঞ্জিনে উঠবেন নাবার্মার যুদ্ধে ব্রিটিশকে সাহায্য করা যাবে নাবন্ধ করতে হবে ট্রেন চলাচলযেই কথা সেই কাজচিৎপুর স্টেশনে সমস্ত ট্রেন থেমে রইলোচারদিকে হুলস্থূল পড়ে গেলখবর পেয়ে রেলের গোরা সাহেবরা সবাই পড়িমরি করে ছুটে এলেনপ্রথমে হুমকি ধামকি, তারপর অনুরোধ-উপরোধকিন্তু কিছুতেই কাজ হলো না

তাঁরা সিদ্ধান্তে অটলঅবশেষে গোরারা শরণাপন্ন হলেন তাঁদের নেতাদেরখবর পেয়ে ছুটে এলেন কমরেড মুজফফর আহমেদ আর সোমনাথ লাহিড়ীসহ ক'জন নেতাঅনেক বোঝালেন তাঁদের কিন্তু তাঁরা তাঁদের সিদ্ধান্তে তখনো অটল

জসীমউদ্দীন মণ্ডলরা বললেন, "এতদিন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথা বলেছেন, কিন্তু আজ যখন ব্রিটিশকে বাগে পাওয়া গেছে, তখন আপনারাই আবার সুর বদলে বলছেন, ব্রিটিশকে সাহায্য করোএ আপনাদের কেমন ধারা নীতি?"

এর কারণ হলো ১৯৪১ সালের ২২ জুন হঠাৎ করে ফ্যাসিস্ট হিটলার আক্রমণ করে বসলো সমাজতন্ত্রের সূতিকাগার সোভিয়েত রাশিয়াআর সে প্রেক্ষাপটেই কমিউনিস্ট পার্টি তার নীতি পাল্টাতে বাধ্য হয়েছিলোদেউলি বন্দী নিবাসে আবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম শ্রেণীর নেতৃবৃন্দ ১৯৪১ সালের ১৫ ডিসেম্বর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, এ যুদ্ধ 'জনযুদ্ধ'কাজেই দেশের জনসাধারণকেও এগুতে হবে সেভাবেইএই সিদ্ধান্ত থেকেই বাংলার কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দ জেল থেকে প্রকাশ করলেন একটি ইশতেহারতাতে বলা হলো, "বিপ্লবের কেন্দ্রভূমি রাশিয়া আক্রান্ত, সুতরাং এ যুদ্ধ 'জনযুদ্ধ', যে করেই হোক সর্বশক্তি দিয়ে হিটলারকে রুখতে হবেতার জন্যই আজ ব্রিটিশের সাথে সহযোগিতা প্রয়োজন।"

আন্তর্জাতিক রাজনীতি তখন তাঁরা অতোশতো বুঝতেন নাতাঁদের কাছে তখন ব্রিটিশের বিরোধিতাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছিলোযা'হোক নেতৃবৃন্দ শেষ পর্যন্ত অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁদের ধর্মঘট তুলে নিতে রাজি করালেনরেলের সাহেবরা তাঁদের কাছ থেকে বন্ড লিখিয়ে নিলেন, যুদ্ধের ভেতরে ভবিষ্যতে তাঁরা যেনো এমন কাজ আর না করে! শেষমেষ বিকেলের দিকে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হলো

কিন্তু সেদিনকার সেই ঘটনার জের হিসেবে বেছে বেছে তাঁদের ক'জনকে বদলি করা হলো বিভিন্ন জায়গায়জসীমউদ্দীন মণ্ডলকে বদলি করা হলো কাঠিহার লোকোইয়ার্ডে

১৯৪২ সালের শেষের দিকে তাঁর বন্ধু আফসারের ছোট বোন মরিয়মের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হনতাঁর স্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ জুগিয়েছেন সারাজীবনতাঁর পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে

১৯৪৯ সালের দিকে দুর্ভিক্ষ যখন চরমে, তখন রেলওয়ে রেশন সপ থেকে শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ করা হলো খুদএ ছিলো আর এক প্রহসনপাকিস্তানে এসে রাতারাতি রেলের শ্রমিকরা মানুষ থেকে বনে গেলো মুরগিমুরগির খাবারের খুদই সরবরাহ করতে লাগলো তাদের জন্যমুসলমানের দেশ, তাই অফিসারদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থাতারা পায় চালআর শ্রমিকদের জন্য খুদহায়রে পাকিস্তান! অচিরেই শ্রমিকরা হয়ে উঠলো ক্ষুব্ধতাঁদের নেতৃবৃন্দ ঘনঘন বৈঠক করতে লাগলেন শ্রমিকদের সাথেপ্রকাশ্যে তো কিছু করা যায় না, কারণ শিশু রাষ্ট্র! বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে নাগোপনেই বৈঠক করতেন নেতারাদেশ বিভাগ হলেও তাঁদের ট্রেড ইউনিয়ন কিন্তু তখনো বিভক্ত হয়নি, তখনো তাঁদের কর্মকাণ্ড কলকাতাকে ঘিরেই চলছেতাঁদের সেইসব গোপন বৈঠকে তখন আসতেন সোমনাথ লাহিড়ী, ব্যারিস্টার লতীফ, জ্যোতি বসু, ইলা মিত্র, রমেন মিত্র ও ভবানী সেনের মতো আরও কত নেতা! ঈশ্বরদীতে লাল ঝাণ্ডার কর্মী কমরেড সাহাবুদ্দীনের বাসায় মাঝে-মধ্যেই বসতো তাঁদের গোপন বৈঠকসাধের পাকিস্তানে বাস করে মানুষ থেকে মুরগি কিছুতেই হওয়া যাবে নাঅতএব, আন্দোলনগড়ে তোলো দুর্বার আন্দোলনবন্ধ করে দাও রেলের চাকাটনক নড়ুক কর্তৃপক্ষেরসিদ্ধান্তমতো চারদিকে পড়ে গেলো সাজ সাজ রব শ্রমিকদের মধ্যেআন্দোলনের পক্ষে চলতে লাগলো মিছিল ও পথসভা ইত্যাদি প্রায় প্রতিদিনই

১৯৪৯ সালের দিকের কথাগর্জে উঠলো লোকোসেডের শ্রমিকরাসেড খালাসীরা হাতের গাঁইতি-কোদাল ফেলে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালোপোর্টার, সান্টার, ফায়ারম্যান, ড্রাইভার সবাই কাজ বন্ধ রেখে শরিক হলো মিছিলেমুহূর্তখানেকের ভেতরেই সমস্ত সেড এলাকা নীরব নিথর হয়ে পড়লোতখনো ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিলোফলে দার্জিলিং থেকে কলকাতাগামী সব ট্রেন এসে দাঁড়িয়ে পড়লো ঈশ্বরদী প্লাটফরমেপ্যাসেঞ্জাররা বিরক্ত হলেও সাধারণ মানুষ আর সাধারণ শ্রমিক-কর্মচারিরা কিন্তু মহাউল্লাসে ফেটে পড়লোঠিক হয়েছে বেশ হয়েছে, জসীম মন্ডলরা ঠিক মারই দিয়েছেচালের বদলে তোমরা খাওয়াবে খুদ, আর আমরা মুখ বুজে সব সহ্য করব? এ আর হচ্ছে না

অবশেষে বিকেল পাঁচটার দিকে পাবনা থেকে কয়েক লরি রিজার্ভ ফোর্স এসে পৌছুলোসে সময়কার বিপ্লবী শ্রমিক-কর্মী বাহাদুরপুরের দেলওয়ার দৌড়ে এসে খবর দিলেন, "জসীম ভাই, পালাতে হবে, পুলিশ এসে গেছে।" খবর শুনে তিনি পশ্চিমে শ্রমিক কলোনির একটি বাসায় এসে আশ্রয় নিলেনসারাদিন কিছু খাননিক্ষিদেয় পেট জ্বালা করছিলো তাঁরখাবারের কথা বলতেই শ্রমিক কলোনির অনেকেই খাবার নিয়ে হাজির হলেনশোনা গেলো, স্ট্রাইকের সাথে জড়িত নেতৃবৃন্দকে হন্যে হয়ে পুলিশ খুঁজছেতাই তিনি রেল কলোনিতে থাকা আর নিরাপদ মনে করলেন নাসরে গেলেন আরও উত্তরে আউটার সিগনালের কাছে শ্রমিক কলোনির আর একটি বাসায়

এরপর ট্রেনে চেপে তাঁরা পৌছুলেন আবদুলপুর স্টেশনেসেখান থেকে হাঁটাপথে নাটোর হয়ে বাসুদেবপুর গ্রামের হালদারপাড়ায় গিয়ে উঠলেন গভীর রাতেএরি মধ্যে একদিন খবর পেলেন 'খুদ স্টাইকের' অপরাধে জসীমউদ্দীন মণ্ডল, দেলওয়ার, হামিদ আর রুহুলসহ মোট ছ'জনের নামে হুলিয়া হয়েছেপুলিশ তাঁদের খ্যাপা কুকুরের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছেএই অবস্থায় ঈশ্বরদী ফিরে যাওয়া কোনোক্রমেই নিরাপদ নয়কমরেডরা পরামর্শ দিলেন, সাঁওতাল পাড়ায় গিয়ে সেল্টার নিতেসে সময় সাঁওতালদের ভেতরে পার্টির শক্তিশালী সংগঠন গড়ে উঠেছিলজসীমউদ্দীন মণ্ডলের গায়ের রং-চেহারা আর স্বাস্থ্যের সাথে সাঁওতালদের মিল থাকায় সহজেই ওদের সাথে মিশে গেলেন তিনিফলে ওদের সঙ্গে ক্ষেতে কাজ করার সময় কেউ ধরতেই পারতো না যে তিনি সাঁওতাল ননএভাবে কাজ করতে করতেই কয়দিনের ভেতরে ওরা তাঁকে আপন করে নিলো

ঈশ্বরদীতে সংগঠনের অবস্থার কথা চিন্তা করে মনে মনে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেনঅস্থির হয়ে উঠলেন ভেতরে ভেতরেতাই প্রায় ছ'মাসের মাথায় সাঁওতাল পাড়া থেকে ঈশ্বরদী ফিরলেন একদিনআশ্রয় নিলেন লোকোসেডে কমরেড সাহাবুদ্দিনের বাসায়ওখান থেকেই পুলিশ ১৯৪৯ সালে তাঁকে গ্রেফতার করলো

তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হলো পাবনা জেলেজেল সম্পর্কে তাঁর একটা মোটামুটি ধারণা হয়েছিলো এর মধ্যেইতবে সেটা ছিলো বৃটিশের জেলখানাএর আগেও কয়েকবারই কলকাতা থাকতে জেল হাজতে গিয়েছেনতবে স্বল্প সময়ের জন্যজেলের খাওয়া-দাওয়ার চরম অব্যবস্থার কথা জানা ছিলোতাই ঘাবড়ালেন নারাতে তাঁকে রাখা হলো হাজতিদের সাথে

রাতে দেয়া হলো দুটো করে রুটি আর ডালসে রুটির কী চেহারা! আটার মধ্যে পোকার ছড়াছড়িআর দুর্গন্ধ, সে কথা বলবার নয়তাই খেতে হলোভেবেছিলেন, পাকিস্তানে জেলের বুঝি কিছুটা পরিবর্তন হয়েছেকিন্তু বাস্তবে তার কোনো লক্ষণ টের পেলেন না

ভোরবেলা তাঁকে ঘানি টানতে বলা হলোকিন্তু তিনি ঘানি টানতে নারাজএ অপরাধে তাঁকে পিছমোড়া করে ধরলো দু'জন, আর দু'জন মিলে এলোপাতাড়ি হান্টারের বাড়ি মারতে লাগলোকিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর সারা শরীর আঘাতে আঘাতে রক্তারক্তি হয়ে গেলোতারপর জেলার সাহেবের হুকুমে তাঁকে কয়েদি সেলে তোলা হলোশুরু হলো অমানুষিক নির্যাতনসমস্ত কাপড়-চোপড় খুলে নিয়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে রাখা হলোপায়ের নিচে মেঝেতে পানি ঢেলে দেয়া হলোশীতের দিনপ্রচণ্ড ঠাণ্ডা তার ওপর উদোম গাহুহু করে কাঁপতে লাগলেন তিনিসারাটা দিনই গেলো এইভাবেপেটে অসম্ভব ক্ষিদেজ্বরজ্বর বোধ করতে লাগলেন

সিদ্ধান্ত নিলেন, এই অমানুষিকতার প্রতিবাদ করতে হবেসিদ্ধান্ত নিলেন অনশন করবেনযতোক্ষণ না এর প্রতিকার হয়, ততোক্ষণ ছোবেন না দানাপানি

সারাদিন অভুক্ত রইলেনখাবার ফিরিয়ে দিলেনসবাই জেনে গেলো চার নম্বর সেলের কয়েদি জসীম মণ্ডল অনশন করেছেদিন গড়িয়ে রাত এলো, তাঁকে রাখা হয়েছে তেমনি বিবস্ত্র আবস্থায়

তাঁর 'হাঙ্গার স্টাইক'-এর খবরটা আর চাপা থাকলো নাশেষ পর্যন্ত তা পৌঁছে গেলো কর্তৃপক্ষের কানেজেল কর্তৃপক্ষ হাঙ্গার স্টাইককে বড়ই ভয় করতো সেইকালেহন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন জেলার চাকলাদারপ্রথমে অনুরোধ-উপরোধ, তারপর হুমকি-ধামকিকিন্তু তিনি সিদ্ধান্তে অটলবললেন, 'অনশন কিছুতেই ভাঙবেন নাআপনি ডি.সি. সাহেবকে খবর পাঠান, তার সাথে কথা বলতে চাই' অবশেষে অনন্যোপায় হয়ে জেলার সাহেব খবর পাঠালেন ডি.সি. সাহেবকে

ডি.সি. সাহেব আসার পর তাঁকে তিনি বললেন খাবারের পরিমাণ ও মান বাড়ানোর জন্যকয়েদিদের দিয়ে ঘানি টানা বন্ধ করার কথাও তিনি ডি.সি সাহেবকে বললেন সবকিছু শুনে বললেন, "সব ব্যবস্থা হবেআপনি এখন কিছু খেয়ে নিনআমি আপনার খাওয়া দেখে যেতে চাই।" ডাক্তার সাহেব সঙ্গেই ছিলেনতাঁকে ডাবের পানি আর গ্লুকোজ খেতে দিলেন তিনিজসীমউদ্দীন মণ্ডল অনশন ভঙ্গ করলে ডি.সি. সাহেব জেলারকে বললেন, "যতোদিন ওর শরীর সুস্থ না হয়, ততোদিন ওকে হাসপাতালে রাখবার ব্যবস্থা করবেন।"

এরপর তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হলো হাসপাতালেহাসপাতালে মোটামুটি আরামেই দিন কাটছেখাওয়া-দাওয়াও ভালোপ্রায় ছ'মাস পাবনা জেলে কাটানোর পর তাঁকে বদলি করা হলো রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলেএখানে এসেও তাঁর উপর অনেক নির্যাতন- অত্যাচার চলতে লাগল

১৯৫৪ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেনজেল থেকে ফিরে আসার পর রেলের চাকরি আর করা হয়নি তাঁরকারণ রেল কর্তৃপক্ষ এই মর্মে বন্ড চেয়েছিলেন, 'এরপর থেকে আমি আর কোনরকম আন্দোলনে অংশ নেব না' কিন্তু তিনি বন্ড দিতে অস্বীকার করায় তাঁর আর চাকরি হয়নি

মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর ১৯৫৪ সালেই আবার শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে পোরা হলো জেলেজসীমউদ্দীন মণ্ডলও রেহাই পেলেন না তার আওতা থেকে

এসময় রাজশাহী জেলে কিছুদিন থাকার পর তাঁকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বদলি করা হলোঢাকা জেলে তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বহু কর্মী নেতারা বন্দি জীবনযাপন করছেন১৯৫৬ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন১৯৬২ সালের দিকে আবার গ্রেফতার হলেন তিনি এবং ১৯৬৪ সালের দিকে মুক্তি লাভ করেন

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতা চলে যানসেখানে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে প্রচার চালানমুক্তিযুদ্ধের সময় দশ কাঠা জমির উপর তাঁর স্ত্রীর তিল তিল করে গড়ে তোলা চালাঘর দুটোও বিহারিরা পুড়িয়ে দিয়েছিলো জসীমউদ্দীন মণ্ডলের রাজনীতি করার অপরাধেসেই দশ কাঠা জমিও বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরআজ সারা বাংলাদেশে তাঁর এতোটুকু জায়গা নেই, যে জমিটুকু তিনি নিজের বলে দাবি করতে পারেনএকটি পরিত্যক্ত বাড়িতে বর্তমানে বসবাস করছেনতারও বৈধ মালিক তিনি নন

সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জীবনের পাওয়া-না-পাওয়ার হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখেন, পাওয়ার পাল্লাটি শূন্যবঞ্চনার পাল্লাটি ভারি হয়ে আছে বেশিতবুও হতাশ নন তিনিএ যেনো এক কঠিন নেশা, সুতীব্র আকর্ষণ, যা উপেক্ষা করে থাকা কখনো সম্ভব নয়তাইতো অনাচার-অত্যাচারের প্রতিবাদে এই বৃদ্ধ বয়সেও ছোটেন মিছিলে, ঝাঁপিয়ে পড়েন আন্দোলনেবক্তৃতার ঝড় তোলেন সভামঞ্চেযতদিন বেঁচে থাকবেন, ততোদিন অক্ষুণ্ণ থাকবে তাঁর জীবেনর এই ধারা

 

 সূত্র: জীবনের রেলগাড়ি, সংগ্রামী স্মৃতিকথা- জসীমউদ্দীন মণ্ডল, অনুলিখন-আবুল কালাম আজাদ, প্রকাশনী- সাহিত্য প্রকাশ, প্রকাশক-মফিদুল হকwww.gunijan.org.bd থেকে নেয়া।

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.