শহীদ কম্পরাম সিং : সত্যেন সেন

মে দিসবের সভাবিরাট সভাকৃষক সমিতির ডাকে চারিদিক্কার গ্রামগুলি ভেঙ্গে লোক এসেছেএখনও আসছেহাজার কুড়ি লোক সভায় জমায়েত হয়েছেদিনাজপুরের বিশিষ্ট কৃষক নেতাদের মধ্যে প্রায় সবাই এসেছেন

লাহিড়ীহাট উৎসব সজ্জায় সেজেছেসভার সামনে বিরাট এক লাল নিশান সগর্বে পত্ পত্ করে উড়ছেগেট সাজানো হয়েছে লাল ফেষ্টুন দিয়েএদিকে, ওদিকে, চারদিকেই লাল নিশানের ছড়াছড়িযেদিকেই তাকাও, লালে লালমে দিবস সারা পৃথিবীর মেহনতী মানুষের আনন্দ উৎসবের দিনএই দিনেই সংগ্রামী শ্রমিকদের বুকের রক্তে রঞ্জিত লাল নিশানের জন্ম হয়েছিলসেদিন থেকে এই লাল নিশান সারাবিশ্বের মজুর, কৃষক ও সমস্ত মেহনতী মানুষকে সংগ্রামের পথ নির্দেশ করে চলেছে

কিন্তু এই আনন্দ উৎসবের মাঝখানেও একটা দুঃখের কালোছায়া ছড়িয়ে পড়েছেএকজনের অনুপস্থিতি সবাইকে ব্যথিত করে তুলেছেএখানে ওখানে বলাবলি চলছে- এমন উৎসবের দিন, এত লোক জড় হয়েছি আমরা, কিন্তু কম্পদা আজ সভায় থাকতে পারল নাএত লোকের মাঝখানেও কেমন যেন খালি খালি লাগছে

সকল সময় সব কাজে যিনি পুরোভাগে থাকেন, কাজে-কর্মে যার উৎসাহ আর সকলের উৎসাহকে ছাপিয়ে উঠে, সেই কম্পদা বা কম্পরাম সিং আজ সভায় উপস্থিত থাকতে পারেন নিতার অভাবটা সবার মনেই বাজছেকম্পদার একটি মাত্র ছেলেঅনেক দিন থেকেই সে রোগে ভুগছিলসেই ছেলে গত রাত্রিতে মারা গিয়েছেএ অবস্থায় কম্পদা কি করেই বা আসবেনতিনি ছেলের শবদেহ দাহন করবার জন্য অন্যান্য শ্মশানবন্ধুদের সঙ্গে শ্মশানে গেছেন

সভার উদ্যোক্তারা সভার কাজ শুরু করবার জন্য উদ্যোগ আয়োজন করছেনএকজন নওজওয়ান সভার আরম্ভ ঘোষণা করবার জন্য শ্লোগান দিতে শুরু করলেনসঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মিলিত কণ্ঠের আওয়াজ উঠলসেই মিলিত আওয়াজে সারা আকাশটা থেকে থেকে কেঁপে উঠতে লাগল

শ্লোগান থামতেই সভার লোকেরা সচকিত হয়ে শুনল, দূর থেকে অনুরূপ আওয়াজ ভেসে আসছেএ কি প্রতিধ্বনি? না, প্রতিধ্বনি নয়, লক্ষ্য করে বোঝা গেল, কারা যেন স্লোগান দিতে দিতে সভাস্থলের দিকে এগিয়ে আসছেসম্ভবতঃ কোন গ্রাম থেকে এক দল কৃষক সভায় যোগ দেওয়ার জন্য আসছেঠিকই তাইএকটু বাদেই দেখা গেল, একটা মিছিল একটা ঝোপের আড়াল কাটিয়ে হঠাৎ সামনে চলে এলকারা এরা? সবাই উৎসুক হয়ে লক্ষ্য করতে লাগল

মিছিলটা কাছাকাছি এসে পড়তেই চমকে উঠল সবাইমিছিলের সামনে সবার আগে এ কে? কম্পদা না? হ্যাঁ, কম্পদাই তোতার পাশে একটা সাদা থান পরা বিধমা মেয়েকম্পদা তার হাত ধরে এগিয়ে আসছেন, আর তার সুপরিচিত জলদগম্ভীর কণ্ঠে শ্লোগান দিচ্ছেন, ‘মে দিবস জয়যুক্ত হোক’, ‘দুনিয়ার মজুর চাষী এক হওমিছিলের লোকেরা গলায় গলা মিলিয়ে তার আওয়াজে সাড়া দিয়ে চলেছে

সেই মিছিল যখন সভার সামনে এসে দাঁড়াল তখন সবাই দেখল কম্পদার কোমরে গামছা বাঁধা, তার মাথার রুক্ষ্ম চুলগুলো উড়ছেপিছনে আরও কয়েকজন শ্মশানবন্ধু, তাদেরও ওই একই মূর্তিচেহারা দেখে বোঝা যায় যে, তারা দাহকর্ম শেষ করেই শ্মশান থেকে সোজা সভার জায়গায় চলে এসেছেনতাঁদের পিছনে শখানেক লোক

থান পরা বিধবা মেয়েটির একটা হাত কম্পদার হাতে, আর এক হাত দিয়ে সে নিজের মুখ চেপে ধরে ফুপে ফুপে কাঁদছেসে কি কান্না! কিন্তু কম্পরাম সিং এর চোখে এক বিন্দু অশ্রনেইতিনি সামরিক কায়দায় লাল ঝাণ্ডাকে সেলাম জানিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন আর সেই অশ্রমতী মেয়েটিকে পরম øেহে নিবিড়ভাবে কাছে নিলেনএমন একটা দৃশ্য দেখবার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না! হাজার হাজার লোক, কারুর মুখে কোন কথা নেই, সবাই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেসঙ্গে সঙ্গেই মঞ্চ থেকে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা নেমে এলেনতাঁদের মধ্যে একজন দুহাত বাড়িয়ে কম্পদাকে জড়িয়ে ধরলেনসান্ত্বনার ভঙ্গিতে কি একটা কথা যেন বললেনকিন্তু কম্পদার মুখে কোন ভাববিকার লক্ষ্য করা গেল নাতেমনি অবিচল, স্থিরকোন কথা না বলে বিধবা পুত্রবধূর হাত ধরে তিনি মঞ্চের উপর গিয়ে উঠলেন

সভাপতির অনুমতি নিয়ে কম্পদা কিছু বলবার জন্য উঠে দাঁড়ালেনকুড়ি হাজার লোক উৎকীর্ণ হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে! কি বলবেন কম্পদা? এই মাত্র একমাত্র ছেলেকে পুড়িয়ে ছাঁই করে এলেনআর এখনই উঠে দাঁড়িয়েছেন বক্তৃতা দিতে! এ মানুষ কি পাথর না লোহা দিয়ে তৈরী?

কম্পদা বলে চললেন:

ভাইসব, আজ মে দিবসের সভাআমার আসতে একটু দেরী হয়ে গেলকেন দেরী হল আপনারা হয়তো তা জানেনআমার ছেলে, সে তো শুধু আমার ছেলেই ছিল না, সে ছিল আমার বিপ্লবের সাথী, আমার কমরেডআমার সেই কমরেড আজ আমার পাশে নেইতাকে চিতার আগুনে ছাই করে দিয়ে এলাম

ভাইসব, আপনারা হয়তো ভেবেছিলেন যে, আমি সভায় আসব নাআত্মীয় স্বজনের মধ্যে অনেকে বাধাও দিয়েছিলেনকিন্তু আজ মে দিবসের সভাএই পবিত্র দিনে এখানে আমার হাজার হাজার ভাইরা মিলিত হয়েছেনএমন দিনে আমি কি তাদের মধ্যে না এসে থাকতে পারি! ভাইসব, সারাদেশ জুড়ে লক্ষ লক্ষ কৃষক সন্তান আজ তিল তিল করে মৃত্যুমুখে এগিয়ে চলেছে, বেঁচে থেকেও তারা দিবারাত্রি মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে চলেছেতাদের বাঁচাবার জন্য আমাদের এই সংগ্রামতাদের কথা মনে করলে আমাদের এই ব্যক্তিগত দুঃখ তুচ্ছ হয়ে যায়আপনাদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি আমার পুত্রশোক ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি

সদ্য স্বামীহারা মেয়েটি কম্পদার পায়ের কাছে উপুড় হয়ে পড়েছিলকম্পদা তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, কাঁদিস না বেটী, কাঁদিস নাএই যে তোর সামনে হাজার হাজার কৃষক ভাইকে দেখছিস, এরা তোরই ভাই, তোরই আপনজনএদের সবার সুখ দুঃখের সঙ্গে তোর নিজের সুখ দুঃখ মিশিয়ে নেএদের সঙ্গে এক হয়ে সমিতির কাজে আপনাকে ঢেলে দেএই পথেই শান্তি পাবি, আনন্দ পাবি

এই বলে পুত্রবধূকে পাশে নিয়ে বসে পড়লেন কম্পদাবিহ্বল জনতা কয়েক মুহূর্তের জন্য ভাষা হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলতারপর গগনভেদী ধ্বনি উঠল, ‘কম্পরাম সিং জিন্দাবাদধ্বনির পর ধ্বনি উঠতে লাগল, ওরা কিছুতেই থামতে চায় না

মে দিবস এদেশে প্রতি বছরই নিয়মিতভাবে উদ্যাপিত হয়ে আসছেকিন্তু লাহিড়ীহাটের সেদিনকার সেই মে দিবসের অনুষ্ঠান এক নতুন রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলএ ছবি তুলে ধরার মতএই ছবি দেখে আমাদের দেশের চাষী, মজুর আর মেহনতী মানুষেরা প্রেরণা পাবে, উৎসাহ পাবে, সাহস পাবেকিন্তু যার বলিষ্ঠ তুলির আঁচড়ে এই ছবিটি সার্থকভাবে ফুটে উঠবে, কোথায় সেই শিল্পী?

দিনাজপুর জেলার বালিয়াডাংগা থানার অন্তর্গত উত্তর পারিয়া গ্রামের মাটি উর্বরাএখানে বহু আত্মত্যাগী ও নির্ভীক কর্মীর সৃষ্টি হয়েছেকম্পরাম সিং এই গ্রামে জন্মলাভ করেছিলেনতারা তিন ভাইÑ কম্পরাম সিং, সন্তরাম সিং আর সেবকদাস সিংমধ্যবিত্ত কৃষক ঘরের সন্তান, সুখে দুঃখে জীবন কাটছিলঅবস্থার তুলনায় সমাজে তার মর্যাদা ছিল অনেক বেশীনির্ভীক চরিত্র আর নিঃস্বার্থ সমাজ সেবার জন্য তিনি চিরদিনই সকলের শ্রদ্ধা পেয়ে আসছিলেন

সমাজের সর্বসাধারণের কল্যাণ কামনা জীবনের শেষ পর্যায়ে তাঁকে এক নতুন পথে টেনে নিয়ে এলআমাদের দেশে যে বয়সে লোকে আপনাকে সংসার থেকে গুটিয়ে নিয়ে এসে পরলোকের ভাবনায় ডুবে যায়, সেই সময় পঞ্চাশোর্ধে এসে তিনি নব জন্ম লাভ করলেনকৃষক আন্দোলনের ঢেউ তখন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছেসেই ঢেউ দিনাজপুর জেলার চির-নিপীড়িত কৃষক সমাজকে আন্দোলিত ও প্রাণচঞ্চল করে তুলল! বার্ধক্যের দুয়ারে দাঁড়িয়েও কম্পরাম সিং কৃষক সমিতির আহ্বানে সাড়া দিতে দেরী করেন নি

কৃষক সমিতির নির্দেশে হাটে হাটে তোলাবটি বা তোলাগাণ্ডি আন্দোলন শুরু হয়ে গেলপ্রবল প্রতাপশালী জমিদারেরা দীর্ঘদিন ধরে হাটে হাটে তোলা আদায় নিয়ে অকথ্য জুলুম চালিয়ে আসছিলজমিদারের দুর্দান্ত কর্মচারীরা ক্রেতা ও বিক্রেতা দুপক্ষের কাছ থেকেই ভারী হাতে তোলা আদায় করতনিতান্ত গরীব গরবা মানুষ, যারা দু-চার পয়সার কাজ কারবার করতে যেত তারাও তাদের হাত থেকে রেহাই পেত না

এই অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপত্তি করতে বা প্রতিবাদ জানাতে গেলে মারপিট খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরতে হতকৃষকদের এমন মনোবল বা ঐক্যবদ্ধ শক্তি ছিল না যে, তাদের বিরুদ্ধে সাহস করে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেতারা ভাগ্যের দোহাই দিয়ে সব কিছুই মুখ বুজে সহ্য করে যেতদীর্ঘ দিন ধরে, শুধু দিনাজপুরে নয়, সারা বাংলাদেশ জুড়ে এই ধারাই চলে আসছিলকিন্তু যুগের ধর্মে হাওয়া বদলে গেলদিনাজপুরের কৃষকেরা জমিদারের এই বল্গাহীন জুলুমের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ঘোষণা করল!

ব্যাপার দেখে সারাদেশের লোকের বিস্ময়ের সীমা রইল নাদিনাজপুরের মাটিতে এমন সমস্ত ঘটনা ঘটতে পারে, এ যে স্বপ্নেরও অগোচরদেখা গেল, গ্রামে গ্রামে কৃষক সমিতির লাঠিধারী ভলান্টিয়াররা কুচকাওয়াজ করছেহাটের দিনে তারা সুশৃংখলভাবে মার্চ করে হাটে হাটে যায়, সারা হাট টহল দিয়ে বেড়ায়, মাঝে মাঝে সুবিধামত জায়গায় দাঁড়িয়ে এই জুলুমের বিরুদ্ধে প্রচার বক্তৃতা করে আর কিছু সময় বাদে বাদেই আওয়াজ তোলে- ‘তোলা আদায় বন্ধ কর’ ‘কৃষক সমিতি জিন্দাবাদতাদের মিলিত আওয়াজে সারা হাটটা গম গম করতে থাকেহাটুরে লোকেরা হাতের কাজ বন্ধ রেখে মুগ্ধ হয়ে তাদের বক্তৃতা শোনেওদের সাহস দেখে তারা অবাক হয়ে যায়

লাহিড়ীহাট থেকে পাঁচ মাইল দূরে কম্পরাম সিং-এর গ্রাম উত্তর পারিয়া! কম্পরাম সিং লাহিড়ীহাটের তোলাবটি আন্দোলন পরিচালনা করেনআন্দোলন দিন দিন প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠতে লাগলজমিদার পক্ষও চুপ করে বসে ছিল নাতারা প্রথম থেকেই থানার লোকদের সঙ্গে ঘোঁট পাকিয়ে চলছিলএই সব নিয়ে উপরওয়ালা অফিসারদের সঙ্গেও তাদের দহরম মহরম চলছিলউপরওয়ালা প্রভুরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলযে চাষীরা সাত চড়েও রাকরত না, নিঃশব্দে পড়ে পড়ে মার খেত, তাদের মধ্যে এত সাহস কেমন করে এল? এ তো হবার কথা নয়এর ভবিষ্যৎ ভেবে ওরা দস্তুরমত চিন্তিত হয়ে উঠলআর এদের প্রশ্রয় দেওয়া চলে নাএকটা কিছু করতেই হবে

অবশেষে ওদের যা করবার তাই ওরা করলকম্পরাম সিংকে গ্রেফতার করে জেলখানায় নিয়ে পুরলওরা আশা করেছিল, এরপরে চাষীরা ভয় পেয়ে আন্দোলন থামিয়ে দেবেকিন্তু ওদের মনষ্কামনা পূর্ণ হল নাফল হল উলটোতাদের প্রিয় নেতাকে তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে যাবার ফলে ক্ষেপে আগুন হয়ে উঠল চাষীরাআন্দোলন ভাঙ্গা দূরে থাক, আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে লাগলশেষ পর্যন্ত জমিদার পক্ষ আর সরকার পক্ষের সমস্ত কৌশল ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্নভিন্ন করে চাষীরাই জয়লাভ করললাহিড়ীহাট ভেঙ্গে গেলকৃষক সমিতির উদ্যোগে নতুন আর একটা হাট গড়ে উঠলদিনাজপুর আর রংপুর জেলায় এইভাবে কতকগুলি নতুন হাট গড়ে উঠেছিলতাদের মধ্যে কয়েকটির নাম দেওয়া হয়েছে সমিতির হাটআজও তারা সেই নামেই পরিচিত

তিন মাস হাজত খাটবার পর কম্পরাম সিং মুক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেনতার নাম তখন সারা জেলায় ছড়িয়ে পড়েছেএখন থেকে তার কাজ শুধু তার নিজের এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে রইল না, জেলার নানা জায়গা থেকে তার ডাক আসতে লাগলবিশ্রামের সময় নেইনিজের ঘর সংসারের কথা আর ভবিষ্যতের চিন্তা পড়ে রইল পিছনেতিনি সারাক্ষণের কর্মী হয়ে আপনাকে কাজের মধ্যে ঢেলে দিলেন

তোলাবটি আন্দোলন থেমে যাবার পর কৃষক আন্দোলনের দ্বিতীয় তরঙ্গ জেগে উঠলসারা উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে বর্গা চাষীদের তেভাগা আন্দোলনের প্লাবন বয়ে গেলএই আন্দোলন সবচেয়ে প্রবল রূপ ধারণ করেছিল এই দিনাজপুর জেলায়এখানকার মত এত বড় বড় জোতদার আর কোথাও নেইএমন নিঃস্ব ভূমিহীন চাষীও আর কোথাও দেখা যায় নাসেই জন্যই এখানকার আধিয়ার চাষীরা তাদের জীবনের মায়া ছেড়ে মরিয়া হয়ে লড়তে নেমেছিল

কম্পরাম সিং তার জ্ঞাতিভাই ঠুমনিয়ার ডোমারাম সিং ও রামপুর মোরানীর অভরণ সিং পলাতক অবস্থায় বলিয়াডাংগা, অটোয়ারী ও রানীশংকাইল এই তিনটি থানায় তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব করেনতাঁদের সকলের মাথার উপর হুলিয়া ঝুলছিলকম্পরাম সিং দুই বছর পর্যন্ত পলাতক জীবন যাপন করেনদুই বছর বাদে এই হুলিয়া প্রত্যাহার করে নেবার পর তিনি দেশবাসীর সম্মুখে আত্মপ্রকাশ করেন

স্বাধীনতা লাভের পর মুসলিম লীগের নেতারা গদী দখল করে দৌর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করতে শুরু করলএই সময় ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সমিতি প্রভৃতি শ্রেণী সংগঠনগুলি চূর্ণ করে দেবার জন্য সরকারের তরফ থেকে সুপরিকল্পিতভাবে আক্রমণের পর আক্রমণ চালানো হতে থাকেশত শত কর্মীকে বিনা বিচারে আটক করা হয়এই সময় ১৯৪৯ সালে কম্পরাম সিংকে গ্রেপ্তার করে রাজবন্দী হিসাবে রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়জন্মভূমির বুক থেকে এই তার শেষ বিদায়দিনাজপুরের চাষীরা কি একবারও ভাবতে পেরেছিল যে, তাদের প্রিয় নেতা কম্পদাকে আর কোনদিন তারা দেখতে পাবে না?

রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলের খাপড়াওয়ার্ড সাতজন শহীদের স্মৃতি বহন করছেকম্পরাং সিং সেই সাতজনের একজনএই সাতজন শহীদের নাম কম্পরাম সিং, দেলওয়ার, বিজন সেন, আনোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, সুখেন্দ্র ভট্টাচার্য ও হানিফ শেখ

১৯৫০ সালের ২৪শে এপ্রিলএই দিনটি বিশেষভাবে স্মরণীয়এই দিনেই রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলের খাপড়াওয়ার্ডে রাজবন্দীদের উপর গুলী চালানো হয়গুলীবর্ষণের ফলে সাতজন রাজবন্দী নিহত এবং অন্যান্য রাজবন্দীর মধ্যে অনেকেই গুরুতরভাবে আহত হনতাঁদের মধ্যে একজনের একটা পা কেটে বাদ দিতে হয়ছেতার নাম নুরুন্নবী চৌধুরী

তখন মুসলিম লীগের আমলবাইরে দমননীতির রুদ্র তাণ্ডব চলছিলজেলের ভিতরেও রাজবন্দীদের উপরে চলছিল অমানুষিক দুর্ব্যবহার আর লাঞ্ছনাব্রিটিশ আমল থেকে রাজবন্দী হিসাবে তারা যে সব সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ করে আসছিলেন, মুসলিম লীগ সরকার কলমের এক খোঁচায় তার সব কিছুই কেড়ে নিলেনকিন্তু রাজবন্দীরা তা নিঃশব্দে মাথা পেতে মেনে নেয়নিবিভিন্ন জেলে আটক রাজবন্দীরা দিনের পর দিন মাসের পর মাস সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন তাঁদের এই অধিকারগুলোকে ফিরে পাবার জন্যএই ব্যাপারে ঢাকা জেল ও আরও কয়েকটি জেলে দীর্ঘ দিন ধরে অনশন ধর্মঘট চালানো হয়এই অনশন ধর্মঘটের ফলে ঢাকা জেলে কুষ্টিয়ার শিবেন রায় আত্মাহুতি দিয়ে শহীদ হয়েছেনরাজশাহী সেন্ট্রাল জেলের গুলী চালনার ঘটনা সেই সংগ্রামেরই একটি রক্তাক্ত অধ্যায়

সরকার ও জেল কর্তৃপক্ষের অপমানজনক ব্যবহারের ফলে জেল কর্তৃপক্ষ ও রাজবন্দীদের পরস্পরের সম্পর্কটা ক্রমেই তিক্ত থেকে তিক্ততর হয়ে উঠছিলফলে বাদ-বিসংবাদ, ঝগড়াঝাটি নিত্য-নৈমিত্যিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলজেলখানার পিঞ্জরের মধ্যে আবদ্ধ রাজবন্দীদের উপর এই নির্বিচার ও নির্মম গুলীবর্ষণ তারই চূড়ান্ত পরিণতি

শোনা যায় রাজধানী ঢাকা থেকে গুলী চালনার জন্য নির্দেশ নিয়েছিলরাজবন্দীদের প্রতিরোধ সংগ্রামকে চূর্ণ করে দেবার জন্য ওরা এই নৃশংস জল্লাদের ভূমিকায় নেমেছিল

২৪শে এপ্রিল তারিখে সুপারিন্টেন্ডেন্ট বিল সাহেব তার দলবলসহ রাজবন্দীদের সঙ্গে আলাপ করার জন্য ওয়ার্ডে এলেনসচরাচর এমন সময় তিনি আসতেন নাসেদিন যে পৈশাচিক পরিকল্পনা নিয়ে তিনি এসেছিলেন, সে কথা কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না

বিল সাহেব রাজবন্দীদের প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপ করছিলেনআলোচনা চলতে চলতে কথা কাটাকাটির মধ্য দিয়ে দুপক্ষই উত্তেজনার চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছলসেই সময় বিল সাহেব আচমকা ঘরের বাইরে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেবার জন্য হুকুম দিলেনসমস্ত কিছুই পূর্ব পরিকল্পিত, আগে থেকেই সব কিছুই ঠিক করা ছিল, আলাপ-আলোচনা একটা ভাঁওতা মাত্র

দরজাটা বন্ধ করেই বন্দুকধারী সিপাইরা এপাশ থেকে ওপাশ থেকে জানালার শিকের মধ্য দিয়ে গুলী চালাতে শুরু করলআত্মরক্ষার কোন উপায় ছিল নাগুলীতে গুলীতে ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে গেল সবাই! ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে গেলকিন্তু এতেও তুষ্ট হল না ওরাপ্রথম পর্ব শেষ করে এবার একদল লাঠিধারী সিপাই দরজা খুলে ঢুকে পড়ল ভিতরেতারপর মনের আক্রোশ মিটাবার জন্য যারা বেঁচে ছিল তাদের বেছে বেছে লাঠিপেটা করতে লাগলতারপর হত আহতেরা ঐভাবেই ঘন্টা কয়েক পড়ে রইলযুদ্ধের মধ্যেও শত্রপক্ষের আহত বন্দীদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়এখানে তাও হল নাআহতদের মধ্যে যাদের জ্ঞান ছিল তারা আকণ্ঠ তৃষ্ণায় পানি পানিবলে কাতরে মরছিলকিন্তু নির্মম ঘাতকের দল তা শুনেও শুনল নাস্বাধীনতা লাভের তিন বছর পরে দুর্ভাগা দেশের দেশ-প্রেমিক সন্তানদের এই ভাবেই পুরষ্কৃত করা হল

সেই সাতটি মৃতদেহ ওরা কোথায় লুকিয়ে ফেলল, তাদের কি গতি করল, কেউ তা জানে নাতাঁদের জন্য কোন স্মৃতি সৌধও ওঠে নিশুধু খাপড়াওয়ার্ড সেই বেদনাসহ স্মৃতির গুরুভার বুকে নিয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেবীর শহীদদের রক্তøাত খাপড়াওয়ার্ডের পূণ্যভূমি একদিন কি দেশবাসীর তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হবে না?

এইভাবেই জেলের মধ্যে প্রাণ দিলেন আমাদের কম্পদা- দিনাজপুরের কৃষক সংগ্রামের বীর সেনানী কম্পরাম সিংতখন তাঁর বয়স তেষট্টিদিনাজপুরের চাষীরা, যারা তাঁকে দেখেছে বা তাঁর কথা শুনেছে, তারা তাঁর কথা স্মরণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেদিনাজপুর তথা উত্তর বঙ্গের কৃষককর্মীরা এই মহান দেশ-প্রেমিকের জীবকথা শুনে প্রেরণা পায়, উৎসাহ পায়, চলার পথের সন্ধান পায়তাদের সকলের মধ্যে বেঁচে আছেন আমাদের কম্পদা- দিনাজপুরের কৃষক সংগ্রামের বীর সেনানী কম্পরাম সিং

 

তথ্যসূত্র:

গ্রাম বাংলার পথে পথে- সত্যেন সেন

কালিকলম প্রকাশনী, ৩৪ বাংলাবাজার, ঢাকা, তৃতীয় সংস্করণ- ১৩৮১ (বাং)

 

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.