মুক্তির সংগ্রামে যাঁরা শহীদ কেন ভুলে আছি তাঁদের : কামাল লোহানী

altএদেশে, যদি ভারতবর্ষ উপমহাদেশটাকে ধরি, তবে যে বাংলার আমরা আগত বাসিন্দা ছিলাম, সেদিন তাকে বলা হলো রক্ত স্বাক্ষরের সিমন্তিনী বাংলাশক্, হু্ন, মোগল, পাঠান কেনা এই ভারতকে দখল করে শাসন নিগড়ে বাঁধেনিতেমনি মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসেছিল ইংরেজপ্রথমে বণিক হয়ে ব্যবসার লোভ মেটাবার উদ্দেশ্য নিয়ে ঢুকেছিল বটে, একদিন সর্বগ্রাসী লোভে বণিকের মানদণ্ডই রাজদণ্ড রূপে আবির্ভূত হয়েছিলতারপর তখনকার অখণ্ড ভারতবর্ষে দেশীয় রাজনীতি ক্রমশঃ ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নিয়েছিলযে সংগ্রামের পেছনে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল বিদেশী নাগপাশ থেকে মুক্ত হতেতাইতো চলমান পৃথিবীতে শোষক-শাসকদের ভোগ বিলাসিতা, নিপীড়ন-নির্যাতন থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করে বিশ্বটাকে সত্যিকার অর্থেই সংখ্যাঘরিষ্ঠ দরিদ্র জনগণ, শোষিত-বঞ্চিতদের বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার তাগিদ নিয়ে দুনিয়াটাকে পাল্টে দেবার সে মন্ত্র লুপে ছিলেন মহামতি মার্কসতারই বিচারে ভারতবর্ষে ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত হিন্দু-মুসলিম ধর্মাবলম্বী সিপাহী বিদ্রোহকে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামবলে বিশ্লেষণ করেছিলেনসেই রক্তিম পথের দিশা যেন ভারতকে ক্রমশ: শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তি আর দেশমাতার পূর্ণ স্বাধীনতার পথে আন্দোলন করতেই দিক নির্দেশনা দিয়েছিল

কিন্তু সেই অখণ্ড ভারতে ইংরেজ শাসকশ্রেণী যখন বুঝতে পারল বোধহয় তাদের শাসনের, শাষণের দিন শেষ হয়ে এসেছে, তখনই তারা ভারতকে খণ্ডিত করার কুটনীতিতে প্রলুব্ধ করে ধর্মের ভিত্তিতে দেশটাকে ভাগ করে চলে যাবার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রথমে ১৯৪৩ সালে মহামন্বন্তর, ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে কৌশলে পকিস্তান-হিন্দুস্থান সৃষ্টি করে গিয়েছিলতখন কিন্তু ভারতে নানা কৃষক বিদ্রোহ, নৌ-বিদ্রোহসহ বহু গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিলযদি বলি তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা কিংবা চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ (যা ইতিপূর্বের ইতিহাসে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন নামেই পরিচিত), কিংবা সাঁওতাল বিদ্রোহÑ এ সবই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শোষণ কৌশলের বিরুদ্ধে জনগণের অভ্যুত্থান কি ছিল না? যা কিনা তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক আঙ্গিনায় কংগ্রেস কিংবা মুসলিম লীগের আপোষকামী ও ক্ষমতালিপ্সু চক্রের দরকষাকষির ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিণত হয়েছিলসেই যে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের শীকারে পরিণত হল এই বাংলাও, তা তখন আমরা বুঝতে পারিনিতাই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভূখা হ্যায়শ্লোগানটিকে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিলকিন্তু অবিভক্ত বাংলার আপামর জনতাসাধারণ যখন ধর্মান্ধতার কোপানলে পড়ে পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি খুইয়ে মানসিকভাবে বিবসনাহয়ে ভারতের হাজার মাইলের ব্যবধানে দুই প্রান্তে দুটি খণ্ডকে পকিস্তাননামে মুসলমানিদেয়া হলোপূর্বাংশে আমরা সংগ্রাম সংক্ষুব্ধ বাংলার মানুষ পূর্ব পাকিস্তান নামের তক্মা আঁটলামসে পদানত রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ আমাদের শাসন করার অপক্ক ক্ষমতাহাতে পেল, তখন থেকেই তারা বাংলাকে শায়েস্তা করার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শাসন-শোষণের কাল শুরু

স্মরণযোগ্য, ব্রিটিশ শাসনাবসানের কালেই এই বাংলায় শুরু হয়েছিল কৃষকদের অধিকার আদায়ের লড়াইতা ছিল অসাম্প্রদায়িক, লোক শক্তির অভূতপূর্ব বহিঃপ্রকাশচল্লিশের দশক ছিল যেমন ইংরেজ খেদানোর লড়াই, তেমনি প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থায় জমিদার-জোতদার শ্রেণীর ছিল পরাক্রমসেই দাপট এবং ইংরেজ শাসকদের কূটকৌশলে পশ্চিম এবং পূর্ব বাংলার অমিততেজ মানুষের সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দেয়ার অপকৌশল দেখেছিলাম তেভাগা আন্দোলনে কৃষক সাধারণের সংগ্রামকে নির্মমভাবে দমন করতেসে দমন-পীড়ন ইতিহাসে রক্ত লেখায় লিপিবদ্ধ হয়ে আছেএই বিদ্রোহ নাচোলে সাঁওতাল বিদ্রোহ, রংপুর-দিনাজপুরের তেভাগার সংগ্রাম, নেত্রকোণার হাজং বিদ্রোহ, সিলেটের নানকার বিদ্রোহ নামে চিহ্নিত হলেও এদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ যাঁরা গ্রামে বাস করেন, এছিল তাঁদেরই অধিকার আদায়ের লড়াই, জমিদার-জোতদারদের শোষণের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান এবং ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তানী শাসকচক্রের শাসন যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলনহয়তো বিচ্ছিন্ন ছিল প্রচারে কিন্তু লক্ষ্যে সবাই ছিলেন ঐক্যবদ্ধসেই সাথে যে পাকিস্তানী কপট রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা এবং বৈষম্যমূলক আচরণ পূর্ব বাংলার মানুষকে ১৯৪৮ সাল থেকে ক্ষোভে, বঞ্চনায়, মানসিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, তা থেকেই প্রমাণ হয় আমাদের জন্য সত্যিই এ আজাদী ঝুটাছিলআমরা কপটতার স্বীকারে পরিণত হয়েছিলাম সাধারণ মানুষ

তাইতো সেদিন পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী সামন্ত প্রভূদের পদলেহন করতে গিয়ে সরকার বিরোধী সংগ্রামের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দমননীতির স্টিমরোলার নিয়েতেভাগা আন্দোলনে, শোষণ এবং চলতি শাসন থেকে শোষিত মুক্তাঞ্চল’-এ কী অকল্পনীয় নির্যাতন চালান হয়েছিল, আজ তা ভাবলে গা শিউরে উঠেমুক্ত এলাকা বাড়ী ঘর স্টিমরোলার দিয়ে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে নেতা-কর্মীদের বাড়ীতে বেগুন আর মরিচের টাস লাগিয়ে দেয়া হয়েছিলসে লড়াই ছিল মেয়েমরদ, জোয়ান-বুড়োর সম্মিলিত প্রতিরোধ যুদ্ধতাই মা-বাবাকে ঘরের খাম’ (খুঁটি)-র সাথে বেঁধে রেখে তাঁদেরই সামনে মেয়ে, পুত্রবধূ কিংবা স্ত্রীকেও ধর্ষণ করা হয়েছেএর একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে এই বাংলার ইলা মিত্রের নাম উচ্চারণ করতে পারি নাযিনি ছিলেন নাচোলের রানী মা’, আজও যিনি একই অভিধায় স্মরণীয় কমরেড মনি সিংহ’-এর সেই বিদ্রোহী এলাকা আজও কমিউনিজমনামেই পরিচিতিসেখানে লড়াকু বীরকন্যা রাশিমণি স্মরণীয় হয়ে আছেন কুমুদিনী হাজংয়ের মাধ্যমে যাঁকে ব্রিটিশ রাইফেলসের সিপাহীরা নিয়ে যেতে চেয়েছিলতাঁকে রক্ষা করেছিলেন কিন্তু রাশিমণিও সহযোদ্ধার প্রাণের বিনিময়েদিনাজপুরে তো কমরেড ডোমারাম সিং-এর নেতৃত্বে মুক্তাঞ্চলে গণ-আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলকমরেড গুরুদাস তালুকদার বরেদাভূষণ চক্রবর্তী, কম্পরাম সিংতো এলডাইমেন্ট জান কবুল করেছিলেনরংপুরের নূরুউদ্দিন (নুরুল দিন) থেকে কমরেড মণিকৃষ্ণ সেন, শংকর বোস-এঁদের কথা ভুলি কেমন করে? ভুলি কেমন করে ময়মনসিংহের কমরেড নগেন সরকার, কমরেড আলতাব আলী, জ্যোতি বোস কিংবা পাবনার কমরেড অমূল্য লাহিড়ী, জসিম মণ্ডল, বাবর আলী, প্রসাদ রায়, আমিনুল ইসলাম বাদশার কথা? সিলেটের কমরেড অজয় ভট্টাচার্য, বরুণ রায়, সুজাতা দাশগুপ্তা, অর্পণা পাল রায় চৌধুরী, এমন সবত্যাগী মানুষ- যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন লড়াইয়ের তাঁদের কথা ভুলে যাওয়া যে পাপকিন্তু সেই পাপইতো আমরা করে চলেছি নিরন্তনবর্তমানে সংসদীয় রাজনৈতিক ডামাডোলে আমরা পূর্ব পুরুষদের অবিস্মরণীয় ত্যাগ, তিতিক্ষা, প্রাণ বিসর্জনকে বেমালুম ভুলেই গেছি অথবা মনে থাকলেও স্মরণ করতে চাই না কারণ সে সময় রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় যে দৃঢ়তা, আনুগত্য, আন্তরিকতা ছিল আজ তা নেইঅনেকে বলেন, সময় পাল্টেছে তাই সবকিছুও বদলে গেছেকথাটা ঠিক কিনা একবার ভেবে দেখতে হবেসময়ের সাথে পাল্টায় বটে কিন্তু সংগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্য পাল্টায় নাআন্দোলনের ধ্বনি পাল্টাতে পারে, তাই বলে আন্দোলন, লড়াই, সংগ্রাম পাল্টাবে না, পাল্টেছে এর চরিত্রকিন্তু ইতিহাসতো পাল্টায়নি

সত্যিকথা বলতে কি, যারা এদেশটাকে ভালবাসতেন, তারা চলে গেছেন কিন্তু রেখে গেছেন তাঁদের অনুসৃত রাজনীতি, আদর্শ এবং আন্দোলনের পথসে হিসাবে যদি ভাবি তবে ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়াওয়ার্ডে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তাকেই বিভক্ত বাংলার পূর্বাংশের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ বলে চিহ্নিত করতে পারিএই সম্মুখ যুদ্ধ হয়েছিল রাজবন্দী আর কারারক্ষীদের মধ্যেএকদিকে নিরস্ত্র রাজপথ আর মাঠে ময়দানের লড়াকু রাজনীতির সৈনিক, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ সশস্ত্র জেল পুলিশএমন যুদ্ধ যা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল খাপড়াওয়ার্ডের বন্দী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপরযাদের মধ্যে ছিলেন রেল শ্রমিক নেতা, কৃষক বিদ্রোহের নেতা, ছাত্র সংগঠনের নেতাআর ছিল আদর্শবাদী রাজনীতির প্রবল সাহসএকদিকে ভীত সন্ত্রস্ত সরকারের পেটোয়াবাহিনী অন্যদিকে ছিলেন জনগণের কল্যাণে নিবেদিত মেহনতি মানুষের সকল পেশার বন্ধু

খাপড়াওয়ার্ডের খাঁচায় বন্দী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের উপর হায়েনার মতন সেদিন জেল পুলিশগুলো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলগোলাকৃতি খাপড়াওয়ার্ডের চতুর্দিকে অসংখ্য বিশাল বিশাল জানালায় বসেছে একাধিক রাইফেল, চলছে গুলী অবিরামআর থালাবাটি হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন রাজবন্দীরা সকলেখাঁচায় বন্দী পাখীকে যেন মারা হচ্ছে প্রভুর ইচ্ছায়মারা গেলেন সুধীন ধর, বিজন সেন, সুখেন ভট্টাচার্য, হানিফ শেখ, কম্পরাম সিং, দেলোয়ার আর কিশোর আনোয়ারওরা বীরতাই শহীদ হয়েছেনবীরত্ব দেখিয়েছেন মানুষের কল্যাণে লড়তে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েএই যে বিপ্লবী প্রাণের বিশাল রাজনৈতিক সত্ত্বার এক একজন প্রাণ দিলেন পিশাচের বিরুদ্ধেবাইরের পৃথিবীতে নরমুণ্ডের গেণ্ডুয়া খেলায় মত্ত এই পিশাচেরা সাম্রাজ্য আর সম্পদ লোভে মত্ত হয়ে বিশ্বময় মানুষের স্বস্তি আর শান্তি কেড়ে নিয়েছেযুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মদমত্ততায় মানুষ হত্যায় আজও বেধড়ক লিপ্তক্রমে যেন ওই নরপিশাচ পৃথিবীর সর্বত্র অর্থ আর অস্ত্র ঢেলে মানুষ হত্যা করে দুনিয়াটাকে নিজের কব্জায় রাখতে বুনো হাতির মত ছুটে বেড়াচ্ছেএই অত্যাচার, অকারণ যুদ্ধ কিংবা মানুষ হত্যার শক্তিমত্তা প্রদর্শনের বিরুদ্ধে দুনিয়াজোড়া যে বিপ্লবী প্রাণের যুথবদ্ধ শক্তির উত্থান ঘটেছিল তাকে আন্তর্জাতিকতাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত মানুষ রুখে দেবার যে সাহস পেয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক পৃথিবী গড়ে বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রবল সংগ্রাম থেকে তাকেই একদিন বিপণœ করে দিয়েছিল ডলারের সাহায্যেওই প্রবল শক্তির মাঝে জন্ম নেয়া বিশ্বাসঘাতক এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে মতাদর্শিক বিরোধের সুযোগ নিয়ে

পৃথিবীর সব দেশের মত আমাদের এই ছোট্ট ভূখণ্ডেও সেদিন কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভক্ত হয়েছিল বিশেষ করে দুটো শিবিরেফলে কমজোর হয়ে পড়ল এদেশের যুথবদ্ধ মানুষের সর্বাত্মক সংগ্রামভয়ঙ্কর ছিল সে বিরোধ, বীভৎস ছিল অন্তর্দ্বন্দ্বনির্মম হয়ে দেখা দিল তার পরিণতিঅতীতকে ভুলে নতুন বিরোধ সামনে এনে একে অপরকে ক্রুর দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করলামআমরা তো দ্বিখণ্ডিত হলাম বটেই, সুযোগ নিল সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তসত্যি কথা বলতে কি, সোভিয়েত ইউনিয়ন গেল যেদিকে গণচীন গেল বিপরীতেএই যে বৈরী মানসিকতা, কোন কোন ক্ষেত্রে আদর্শ ছাড়িয়ে সংকীর্ণতার ঘেরাটোপে পেঁচিয়ে গিয়েছিলফলে আমরা যেন নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত, সংগ্রামের ইতিহাস, ইতিহাসের নায়কদেরও ভাগ করে ফেললামইতিমধ্যে দেশের ভেতর প্রবল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশ, নবউত্থিত জনপ্রিয়শক্তি সব কিছুকে ছাপিয়ে সাধারণ মানুষকে দেখলাম জলে ডুবন্ত মানুষের মতনই খড়কুটো ধরে বাঁচবার মতনএই সুপ্ত জাতীয়তাবাদী শক্তির স্বাজাত্যবোধকে লুফে নিলেনআমরাও অতীতের ইতিহাস গৌরবের অধ্যায়কে কোন রকমে নামমাত্র ধরে রেখে কিছুটা নব্য শক্তির উত্থানকে স্বাগত জানিয়ে চলতে থাকলামতাইতো ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলের খাপড়াওয়ার্ডে শহীদ সাত বিপ্লবী নেতা-কর্মী-সংগঠকদের অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে যে রক্তিম পথে চলার পথকে সুগম করে দিয়েছিলেন মুক্তির নিশানায়, তাকে বেমালুম ভুলে গেলাম, সেই অনৈক্যের বেড়াজাল টপকাতে আমাদের কতটা অমূল্য সময়ই ফেলে আসতে হচ্ছে, হয়েছে

খাপড়াওয়ার্ডে যাঁরা নিরস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও আদর্শের বিপুল শক্তিধর হাতিয়ারকে অবলম্বন করে সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতার বাসপোযোগী স্বদেশ গড়ার শপথে বলীয়ান, সমাজতন্ত্রের সৈনিকেরা লড়েছিলেন জীবনবাজী রেখেনির্দ্বিধায় প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন জেলের ভেতরেও মানুষের জন্যে লড়াই করে অধিকার আদায় করা যায়ওরাতো জেলখানার সাধারণ কয়েদী মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করার বিরুদ্ধে এবং তাদের উপর পরিচালিত নিপীড়নকে রুখে দিতে আর সুস্থ জীবনধারণের জন্য পরিমিত খাবার পরিবেশ ও অকথ্য পরিশ্রমী শাস্তিথেকে উদ্ধারের জন্য জেল কোডকেই পরিবর্তন করতে পেরেছিলেন ধর্মঘট, অনশন এমনি লড়াইয়ের মাধ্যমেতেভাগা আন্দোলনের নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের জখমী দেহে কী নির্মমভাবেই না ঘানিটানা, গম পেশার কাজ করানো হতো কিংবা চলাফেরা করতে না পারা নিপীড়িত অসুস্থদের পর্যন্ত পানি বয়ে নেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো  না পারলে প্রহরারত পুলিশ তাঁদের উপর চালাতো অত্যাচার, জেলকর্তৃপক্ষের হুকুম ছিলকারণ গোয়েন্দা রিপোর্ট ও জেল রেকর্ডে ছিল ওরা কমিউনিস্ট এবং সংগ্রামের এক একটি শক্তিধর মানুষতাই জেলকর্তৃপক্ষ নিপীড়কের নির্মম ভূমিকা পালন করতোনা হলে বন্দী মানুষকে চতুর্দিক থেকে গুলী করে পাখির মতন হত্যা করার ইতিহাস কোথায় মেলে? এরা কি অপরাধ করেছিলেন যে এভাবে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে নির্মমভাবে হত্যা হবেন? এরাতো বাইরে থাকতে জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই, সংগ্রামের সৈনিক ছিলেনতাদেরই বন্দী করে নির্মম অত্যাচারের শিকার বানিয়ে বেধড়ক হত্যা কেন করা হয়েছিল? আজও কি তার কোন কিনারা বা যারা এমন নৃশংস বর্বরতার নায়ক ছিল, তাদের ধিক্কার দিয়ে একটা কথাও বলতে শুনি? আজ থেকে ৬২ বছর আগে সে মানুষগুলো মেহনতি মানুষের পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অধিকার আদায়ের লড়াই করে কারান্তরালেও নির্মম নির্যাতনের শিকার এবং প্রাণ বিসর্জন দিলেন, অনেকেই পঙ্গুত্ব নিয়ে বাকি জীবন যাপন করে গেছেন, তাঁদের প্রতি এমন অনীহা কেন, বর্তমানের প্রচলিত রাজনীতির কুশীলবদেরতবে কি তারা তথাকথিত গণতান্ত্রিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করতেন না, এই কি তাদের অপরাধ? তাঁরা চেয়েছিলেন প্রচলিত ভোগবিলাসী পুঁজিতান্ত্রিক সমাজ পাল্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জন্যে শ্রেণী বৈষম্য ও শোষণহীন সমাজ নির্মাণ করতে, এই কি আজকের সংসদীয় রাজনীতিতে গা ভাসিয়ে দেওয়া চক্রের চোখে অপরাধ? তাই আজ তারা বেমালুম ওই খাপড়ার লড়াই আর লড়াকু মানুষ, এমনকি সাতজন বিপ্লবীর হত্যাকাণ্ডকে এদেশের নব অভ্যুদয়ের ইতিহাসেই স্থান দিতে চান নাভুলেও একবার বলেন না, পাকিস্তানী নরপিশাচেরা আমাদের পূর্বসূরী, সংগ্রামী মানুষকে কেন হত্যা করেছিল

কী নির্মম ছিল হত্যা পরিকল্পনাএকেতো জেলের ভেতরে, তার উপর রাজনীতির বিভিন্ন ফ্রন্টের সব মানুষগুলোকেই পাকিস্তানী হায়েনা বন্দী করে এনেছিলওদের হত্যা করতে আসা ওই কসাই-জল্লাদ শুধু গুলী করে মানুষ হত্যা করেনিপিপাসার্ত বন্দী রাজনীতিক যখন পানি চেয়েছে, জেল সুপার মিঃ বিল তখন কারারক্ষী একজনকে মুখে প্রস্রাব করে দেয়ার অর্ডার দিয়েছিলকমরেড নূরুন্নবী, অনন্ত দেব, বাবর আলী, আমিনুল ইসলাম বাদশা, প্রসাদ রায়সহ ৩২ জন জখম হয়েছিলেনসারা জীবন তাদের এই ক্ষত বহন করতে করতে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছেঅবশ্য অনন্ত দেব এবং কমরেড মণি সিংহের শ্যালককে ভারতের শীলং-এ পাঠিয়েছিল চিকিৎসার জন্য, অনন্ত দা এখনও বেঁচে আছেনতাঁর গায়ের গুলীবিদ্ধ শার্টটি তিনি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেনআমি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দিয়েছিলাম অনন্তদার হাত দিয়েই

পাকিস্তানী আমলে এভাবেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং সরকারবিরোধী কার্যকলাপের জন্য মিথ্যা, বানোয়াট মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে বছরের পর বছর জেলখানায় বন্দী করে রাখা হত এবং চলতো নানা ধরনের নিপীড়নতাইতো বলি, এদেশটাকে মুক্ত করার জন্য, সুখী, সমৃদ্ধশালী গড়ার লক্ষ্যে, বঞ্চিত-শোষিত জীবন থেকে সর্বাত্মক মুক্তির কামনায় যাঁরা জীবনে কিছু পাবার আশায়, ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার বা ভোগ-বিলাসিতার জন্য নয়, কেবলই বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের শোষণহীন রাজকায়েমের উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের কথা একেবারে ভুলে যেতে চাইছি, কেবলমাত্র সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী কিছু মানুষ, দল বা গোষ্ঠী ছাড়াযে মানুষগুলো মুক্তিসংগ্রামের বিজয়যাত্রা সূচনা করেছিলেন, তাদেরই আমরা ভুলে আছিওরাই তো আমাদের পূর্বসূরী, লড়াইয়ের অগ্রসেনাওঁরা বীরওঁদের এতটুকু সম্মানও আমরা দিতে পারিনি

কামাল লোহানী

৯ এপ্রিল, ২০১২

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.