রণেশ দাশগুপ্ত: অমিত রঞ্জন দে

মা-বাবা: মা ইন্দুপ্রভা (সেন) দাশগুপ্ত; বাবা অপূর্বরত্ন দাশগুপ্ত, ভাইবোন: চার ভাই, পাঁচ বোনের মধ্যে রণেশ দাশগুপ্ত ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান, কিন্তু প্রথম পুত্রএই পরিবারের প্রথম সন্তানের নাম প্রতিভা দাশগুপ্ত, ডাকনাম ডলিরণেশ দাশগুপ্তের অন্য ভাইবোনের কয়েকজন হলেন: শেফালি দাশগুপ্ত (খুকি), প্রবীর দাশগুপ্ত, অজিত দাশগুপ্ত (ছুটু)রণেশ দাশগুপ্তের ডাকনাম ছিল খোকা

শৈশব ও শিক্ষারম্ভ: রণেশ দাশগুপ্তের শৈশব কাটে ভারতের পুরুলিয়াতেপুরুলিয়ায় রামপদ পণ্ডিতের পাঠশালায় রণেশ দাশগুপ্তের হাতেখড়ি হয়পরে রাঁচি জেলা স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে

কলেজ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা: ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে বাঁকুড়া খ্রিশ্চিয়ান কলেজে ভর্তি; পরের বছর সেখান থেকে রাজনৈতিক কারণে বহিষ্কারতারপর কলকাতা সিটি কলেজে ভর্তি১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে আই. এসসি. পাসবরিশালে আগমন ও বি. এম. কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বি. এ. শ্রেণিতে ভর্তিনতুন বাসস্থান জেঠু সত্যানন্দ দাশগুপ্তের বাসভবন সর্বানন্দ ভবনেরাজনীতি সংশ্লিষ্টতা এবং বাড়ীতে বেশি বেশি লোক এসে ভীড় জমানোর কারণে অবশেষে বিএম কলেজ ছাত্রাবাসেবি. এ. পাস না করেই ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে বরিশাল থেকে ঢাকায় আগমন

রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতা: রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা বলা চলে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারস্বদেশী বিপ্লবী প্রায়  প্রতিটি আন্দোলনেই তাঁর পরিবারের একটা বড় সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিলরণেশ দাশগুপ্তও রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়েছিলেন একেবারে স্কুলজীবনেটেকনিক্যাল স্কুলের ছাত্র তাঁর চেয়ে বয়সে সামান্য বড় হরিপদ দে তাঁকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেনতিনি অনুশীলন গ্রপেরসঙ্গে জড়িত ছিলেনরাঁচিতে থাকতে হরিপদ দে’-র সঙ্গে পরিচয়-আলাপ আর পার্টির লিটারেচার পড়ে অনুশীলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সেই থেকেই এর সূত্রপাততবে কলেজে এসে যেন রাজনীতি তাঁকে পেয়ে বসলমাথায় ছিল ব্রিটিশ বিরোধিতাতাই স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে তাঁর নেতৃত্বে কলেজের তিনজন ছাত্র মিলে বাঁকুড়ায় প্রথম ভারতীয় পতাকা তোলা হয়সেটা ১৯৩০ এর জুলাই মাসকিন্তু এর প্রতিক্রিয়া এতই মারাত্মক হলো যে, কলেজ থেকে তাঁকে বের করে দেয়া হলোকলকাতা সিটি কলেজ থেকে আইএ পাশ করার পর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে পাবিারিক চাপে তাকে চলে যেতে হয়েছিল বরিশালেসেখানে গিয়ে বরিশাল বি. এম. কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বি. এ. শ্রেণিতে ভর্তি হন রণেশ দাশগুপ্ত, সেখানেও যুক্ত থাকেন রাজনীতিতেবিএম কলেজ ছাত্রাবাসে থাকা অবস্থায় জাগরণী গোষ্ঠীনামে একটি বিপ্লবী গ্রপ সংগঠিত করেনপরে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা মিউনিসিপ্যাল্টির কমিশনার প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিত হন

কারাবাস: রণেশ দাশগুপ্ত প্রথম কারাবরণ করেন ১৯৪৮ সালের ১০/১১ মার্চবাংলা ভাষার পক্ষে প্রচারণার জন্য ভাষা আন্দোলনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে তিনি গ্রেফতার হন এবং বেশ কিছুদিন কারাভোগ করেনতাঁকে ঐ বছরের ৭ জুন পুনরায় গ্রেফতার করে বিনা বিচারে ঢাকা কারাগারে আটক রাখা হয়১৯৪৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে রাজবন্দিরা তিনবার অনশন ধর্মঘট করেনচতুর্থবারের ধর্মঘটে সরকার কর্তৃক কিছু দাবি মেনে নেওয়া হয়দীর্ঘ ৭ বছর ৮ মাস কারাভোগের পর ১৯৫৫ সালে তিনি কারামুক্ত হনএরপর তিনি রেজাছদ্মনামে আত্মগোপন করেন১৯৬২ সালে সামরিক আদেশ বলে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৩ সালে মুক্তি পানএরপর ১৯৬৫ সালে তাঁকে আবার গ্রেফতার করা হয়এ পর্যায়ে তিনি তিন বছর কারাভোগের পর ১৯৬৮ সালে কারামুক্ত হনদীর্ঘ ৭৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ১২ বছর তাঁকে কারাগারে অবরুদ্ধ থাকতে হয়

কর্মজীবন: প্রথাগত চাকরির অভিলাষী ছিলেন না রণেশ দাশগুপ্ত১৯৩৮ সালে ঢাকাতে নলিনীকিশোর গুহ সম্পাদিত সোনার বাংলাপত্রিকার সহকারি সম্পাদক হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়পিতার মৃত্যুর পর সংসারের অর্থাভাব মেটাতে একটি ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে তাঁকে চাকরী নিতে হয়১৯৫৫ সালে কারামুক্তির পর স্বল্প সময়ের জন্য তিনি ইত্তেফাকে যোগ দেনএরপর ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে বামপন্থীদের পরিচালিত দৈনিক সংবাদ-এ যুক্ত হন১৯৭৫-পর্যন্ত এ সংযুক্তি অব্যাহত ছিলএরপর পশ্চিমবঙ্গ-জীবনে আর কোথাও কর্মসূত্রে সম্পৃক্ত তিনি ছিলেন না

সাহিত্যকর্ম: লেখক রণেশ দাশগুপ্ত ছিলেন জীবনঘনিষ্ঠ সাহিত্যিকতাঁর কাছে সাহিত্য নিছক সাহিত্যের জন্য নয়; সাহিত্য হল বাস্তব সমাজ ও জীবনের প্রতিচ্ছবি১৯৫৬ সালে আত্মগোপনে থাকাকালে তিনি মাও সে তুং-এর শত ফুল ফুটতে দাও’-এর অনুবাদ করেন এবং কার্ল মার্কসের জীবনী রচনা করেন১৯৫৯ সালে উপন্যাসের শিল্পরূপপ্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্য অঙ্গনে তিনি আত্মপ্রকাশ করেনকারাগারে থাকাকালীন সময়ে প্রকাশিত হয় আলজেরিয়ার মুক্তিসংগ্রাম’ (১৯৬২), ‘শিল্পির স্বাধীনতার প্রশ্নে’ (১৯৬৬) ইত্যাদিএরপর একে একে প্রকাশিত হয়- ল্যাটিন আমেরিকার মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭০), আলো দিয়ে আলো জ্বালা (১৯৭০), রহমানের মা ও অন্যান্য গল্প (১৯৮৪), আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপ (১৯৮৬)

সেদিন সকালে ঢাকায় (১৯৮৭), সাজ্জাদ জহীর প্রমুখ (১৯৮৮), মুক্তিধারা (১৯৮৯), সাম্যবাদী উত্থান প্রত্যাশা: আত্মজিজ্ঞাসা (১৯৯৪)এছাড়াও তিনি হেনরি এলেগের দ্য কোয়েশ্চেন-এর অনুবাদ, ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতা-অনুবাদ, জীবনানন্দ দাশের কাব্যসম্ভার সম্পাদনা, গোর্কি-মায়াকোভস্কি-নেরুদার কবিতাসংকলন, স্বাধীনতা-সাম্য-বিপ্লবের কবিতা এবং অসংখ্য অগ্রন্থিত প্রবন্ধ ও কিছু অমর কবিতা রচনা করেনদীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে সাহিত্য ছিল তাঁর জীবনসঙ্গী

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.