নরেন্দ্রমোহন ঘোষচৌধুরী

লক্ষ্মীপুর ছেড়ে তিনি পালিয়ে রইলেন তার দিদির বাড়িতে- কলিহাটিতে। সঙ্গে ছিলেন অনন্ত মিত্র। দু মাস পরে নরেনবাবুর পিতার চেষ্টায় মোতাহের আলি মোকদ্দমা তুলে নেয়। নরেনবাবু আবার এলেন লক্ষ্মীপুরে। কিন্তু মোতাহের ছেড়ে দিলেও অলিউল্লা মৌলবি তাঁকে অতিষ্ঠ করে তুলল। অলিউল্লার দৌরাত্ম্যের জন্য গঙ্গাবাবু দারোগা তাকে গালাগাল দিয়ে তাড়ালেন। নরেনবাবুও ওখানে আর না থেকে চলে এলেন বরিশালে এবং ভর্তি হলেন ব্রজমোহন স্কুলে এন্ট্রান্স ক্লাসে। থাকতেন ব্রজমোহন স্কুলের ছাত্রাবাসে।
লক্ষ্মীপুরে নরেনবাবুর ছিল উচ্ছৃঙ্খল জীবন, লেখাপড়ার ধার ধারতেন না, যা তা করে বেড়াতেন। কিন্তু বরিশালে এসে তাঁর আরম্ভ হল নূতন জীবন। সংস্পর্শে এসেছেন অশ্বিনীকুমার দত্তের, আচার্য জগদীশের- ছোঁয়া লেগেছে পরশমণির। সর্বোপরি সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে তিনি পেয়ে গেলেন জীবনের আদর্শ ও পথ। আত্মার অবিনশ্বরত্ব তাঁর মরণভয় দূর করে দিল। তাঁর ভিতরের মানুষটি দুর্জয় হয়ে উঠল বিপ্লবীরূপে। ক্লাসের পড়ায় মন নেই। পড়ছেন বীরের কাহিনী, রাজস্থানের বীরত্বগাথা, দেশের জন্য রানা প্রতাপের আত্মত্যাগ, শিবাজির শৌর্য বীর্য, ম্যাজিনি ও গ্যারিবল্ডির জীবনকথা, ইটালির স্বাধীনতা-প্রচেষ্টা, আয়ারল্যান্ড ও রুশিয়ার বিপ্লবী ইতিহাস।
সতীশচন্দ্র একখানি তৈরি অস্ত্র পেলেন। একে ধারালো করে নিতে হবে। সতীশচন্দ্র তখনও ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক। ওই স্কুলের আরও দুজন শিক্ষক অবনী বন্দ্যোপাধ্যায় ও ষষ্ঠীচরণ ঘোষ সতীশচন্দ্রের সঙ্গে ছিলেন বিপ্লবী কাজে। নরেনবাবুর অসীম সাহসিকতা তাঁদেরও আকৃষ্ট করল। তারা বলতেন, ‘নরেন, দিনে আমরা তোমার গুরু, রাত্রে তুমি আমাদের গুরু।’ তাই হল। অর্থ সংগ্রহের জন্য বরিশালের অদূরে একটি ডাকাতি হল। সে কাজে অবনী বন্দ্যোপাধ্যায় সক্রিয় ছিলেন। নেতৃত্ব করেছিলেন নরেনবাবু (১৯০৮ ডিসেম্বর)।
এই ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসেই মায়ার সাহেবের বাড়ি থেকে চারটি ব্রিচলোডার গান, আর একটি উইনচেস্টার রাইফেল চুরি করে আনা হয়েছিল। এই কাজে অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শিক্ষক সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্মতি ছিল। নরেনবাবুর সঙ্গে ছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ বসু, অনন্ত মিত্র (তখন পুলিশ অফিসের চাকুরিয়া), মানপাশার দেবেন বন্দ্যোপাধ্যায় ও যতীন চক্রবর্তী। এই কাজে যাবার আগে একদিন নরেনবাবু কুঠির দারোয়ানকে আটআনা বখশিশ দিয়ে কুটির কামরাগুলো ও বন্দুক রাখার ঘর দেখে এসেছিলেন।
১৯১১ খ্রিস্টাব্দে নরেনবাবু ১০৯ ধারা মতে উজিরপুরে গ্রেপ্তার হন। তিনজনের ব্যক্তিগত জামিনে ও নগদ এক হাজার টাকা জমা দিয়ে মুক্তিলাভ করেন। ১৯১১ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত এক বছর তিনি নোয়াখালিতে একটা মাইনর স্কুলে মাস্টারি করেন।
১৯১৩ সালে নরেনবাবুর জামানতের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যেতেই তিনি গ্রামের মাস্টারি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। এই সময়ে নানা কারণে দলের প্রধান কর্মকেন্দ্রও বরিশাল থেকে কলকাতায় সরিয়ে নেওয়া হয়।
কলকাতায় বৈপ্লবিক কার্যে বরিশাল দলের প্রথম যোগাযোগ স্থাপিত হয় বিপিন গাঙ্গুলি, অনুকূল মুখার্জি, গিরীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিশ্চন্দ্র শিকদার, প্রভাসচন্দ্র দে প্রভৃতি নেতৃবৃন্দের দ্বারা পরিচালিত আত্মোন্নতি সমিতির সঙ্গে। বিপিনবাবুদের দলের সঙ্গে বরিশাল দলের সহযোগিতায় রডা কোম্পানির জন্য আনীত ৫০টি মজার পিস্তল ও ৫০,০০০ কার্তুজ অপহৃত হয় ১৯১৪ সালের ২৬ আগস্ট। এই কাজে নরেনবাবুর উপর ভার ছিল প্রয়োজন হলে পুলিশের সঙ্গে লড়াই করে কার্যোদ্ধার করা। যে গুলি-ভরা বাক্সগুলি নরেনবাবু ও সুরেশবাবু এনেছিলেন, সেগুলি যাতে পুলিশেত হাতে না পড়ে, তার নিরাপত্তার জন্য (ভড়ৎ ংধভব পঁংঃড়ফু) মনোরঞ্জন গুপ্ত চন্দননগরের মতিলাল রায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে তার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯১৫ সালে হেদুয়া দীঘির ধারে সকালবেলা পুলিশ কর্মচারী সুরেশ মুখোপাধ্যায়কে হত্যা করা হয়। সঙ্গে ছিলেন চিত্তপ্রিয় রায়, মনোরঞ্জন সেন, শচীন দত্ত প্রভৃতি।
নরেন সরকার নরেন ঘোষচৌধুরীকে নদীয়া জেলার শিবপুর গ্রামের একটা বাড়ি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। নরেন সরকারের বিশ্বাস ছিল যে সে বাড়ি থেকে প্রচুর অর্থ পাওয়া যাবে। নরেন ঘোষচৌধুরী বাড়ি, পথঘাট দেখে এসে পরিকল্পনা রচনা করলেন এবং তদনুসারে কাজও সম্পন্ন হল। কিন্তু কাজ শেষ হতে হতে রাতের অন্ধকার থাকল না, দিনের আলো দেখা দিল। গ্রামের লোকেরা প্রকাশ্য দিবালোকে ডাকাতদের পশ্চাদ্ধাবন করল। মাঝে মাঝে লড়াই হতে লাগল কখনো গ্রামের লোকদের সঙ্গে, কখনো পুলিশের সঙ্গে। এই ব্যাপারে যাঁরা সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাঁদের মধ্যে নিুলিখিত ব্যক্তিবর্গের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
সত্যরঞ্জন বসু, সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, নিখিলরঞ্জন গুহরায়, হরেন ভট্টাচার্য ব্যাকরণতীর্থ, শচীন দত্ত, সুধীর দাশগুপ্ত, সতীন্দ্রনাথ সেন, রাধিকা গাঙ্গুলি, বিজয় মিত্র, ভূপেন ঘোষ, সানুকূল চ্যাটার্জি, প্রফুল্ল মজুমদার, ক্ষিতীশ চৌধুরী, যোগেন্দ্রনাথ বসু, মনোরঞ্জন গুপ্ত, ত্রিবেণী সুর, নগেন চক্রবর্তী।
নরেন ঘোষচৌধুরী ছিলেন সর্বাধিনায়ক। ফেরার পথে এঁদের মধ্যে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে যান।
এই ডাকাতিতে যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাদের নিয়ে যে মামলা হয় তাতে দশ বছর দ্বীপান্তরবাসের সাজা হয়েছিল হরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ব্যাকরণতীর্থের। সতীন সেন, বিজয় মিত্র ও রাধিকা গাঙ্গুলি বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। আর নরেন ঘোষচৌধুরী, সত্যরঞ্জন বসু, সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, নিখিলরঞ্জন গুহরায়, শচীন্দ্রনাথ দত্ত, ভুপেন্দ্রনাথ ঘোষ, সানুকূল চট্টোপাধ্যায় এবং দীনবন্ধু- এই আটজনের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরবাসের সাজা হয়। মনোরঞ্জন গুপ্ত, যোগেন্দ্রনাথ বসু, ক্ষিতীশচন্দ্র চৌধুরী, প্রফুল্ল মজুমদার প্রভৃতি এবং আরও কয়েকজন এই ব্যাপারের সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও এই উপলক্ষে গ্রেপ্তার হননি বলে তাঁরা এই মামলার আসামি শ্রেণীভুক্ত হননি। এই সময়টায় তাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কেউ ভারতরক্ষা আইনে, কেউ বা ১৮১৮ সালের ৩ নং আইনে।
১৯২৭ সালে অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের সঙ্গে নরেন ঘোষচৌধুরীকেও আন্দামান থেকে কলকাতার জেলে নিয়ে আসা হয়। বাংলা গভর্নমেন্টের তৎকালীন সেক্রেটারি মি. স্টিফেনসন জেলে নরেনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। সঙ্গে ছিল চার্লস টেগার্ট। উভয়ের মধ্যে যে কথাবার্তা হয়, তা নিুে দেওয়া হল। এ বিষয়ে নরেনবাবু নিজে যা বলেছেন, তাই লিপিবদ্ধ করা হল। আন্দামানে বহু বছর নির্যাতন সহ্য করার পরে এই কথোপকথন নরেনবাবুর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে।
স্টিফেনসন- আপনি যদি ছাড়া পান, তাহলে ধর্মসংক্রান্ত কাজ করবেন? আর রাজনৈতিক কাজ ছেড়ে দেবেন?
নরেন ঘোষচৌধুরী- কোন কাজকে ধর্মসংক্রান্ত কাজ মনে করেন আপনি?
স্টিফেনসন- কত সাধুসন্ত আছেন এ দেশে, তাঁদের কাছে যান।
নরেনবাবু- স্বর্গ বা মুক্তিতে আমার কোনো আকর্ষণ নেই।
স্টিফেনসন- তবে কী চান আপনি? রাজনৈতিক ডাকাতি আর খুন?
নরেনবাবু- আপনারা তো নিজেদের সভ্য জাতের মানুষ বলে দাবি করেন কিন্তু আপনারা জালিয়ানওয়ালাবাগে হাজার হাজার লোককে খুন করেছেন, এমনকী মেয়েদের, শিশুদেরও রেহাই দেননি।
স্টিফেনসন- স্যার চালর্স টেগার্ট বলছেন, আপনি আঠারোটি রাজনৈতিক হত্যা ও বত্রিশটি ডাকাতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
নরেনবাবু- যদি তাই সত্য হয়, তবে আমাকে আঠারোবার ফাঁসিকাষ্ঠে লটকে দিন, আর বত্রিশবার দ্বীপান্তরে পাঠান। টেগার্ট! ওই নচ্ছার দুর্বৃত্ত যা খুশি তাই বলতে পারে। ও একটা জঘন্য মিথ্যাবাদী। আমার গ্রেপ্তারের সময়ে আমার উপরে যে অত্যাচার হয়েছিল সেকথা বলতে গিয়ে এই লোকটা আদালতের সম্মুখে বাইবেল চুম্বন করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে।
স্টিফেনসন- স্যার চার্লস টেগার্ট না বলে শুধু টেগার্ট বলছেন কেন?
নরেনবাবু- লোকটা স্যার না ম্যাডাম আমি জানি না। আমি জানি সে একটা দুর্জন। তিনবার তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রতিবার সে আমাকে নরেন বলে সম্বোধন করেছে! শূয়োর-শূয়ারকা বাচ্চা বলে গাল দিয়েছে! আমিও তার উপযুক্ত ভাষায়ই জবাব দিয়েছি।
স্টিফেন- বহুৎ আচ্ছা। আর আপনার সঙ্গে বথা বলব না।
নরেনবাবু- আপনি ভুলবেন না যে আমি আপনার দর্শনার্থী হয়ে নিজে থেকে আসিনি। আপনিই স্বেচ্চায় আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
স্টিফেনসন- আপনার পিতা অতি বৃদ্ধ, প্রায় অন্ধ। আমি তার জন্যই এসেছিলাম।
প্রথম জার্মান যুদ্ধের সময়ে ১৯১৫ সালে একই সময়ে সমগ্র ভারতে একটা বিদ্রোহী অভ্যুত্থানের আয়োজন হয়েছিল। এই আয়োজনে নরেনবাবুর একটি বাহিনীর প্রধান হিসেবে অংশ গ্রহণ করার কথা ছিল। পূর্ববঙ্গ জয় করে বিদ্রোহী সৈন্যবাহিনী নিয়ে কলকাতায় এসে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ জয়ে তার অংশগ্রহণ করার কথা ছিল। কথা ছিল জার্মানি থেকে অস্ত্র আসবে এবং সেই অস্ত্র নিয়ে কাজ শুরু করা হবে। কিন্তু ইংরেজের তৎপরতায় জার্মানির অস্ত্র এ দেশে পৌঁছাতে পারেনি।
শিবপুর ডাকাতির মামলায় নরেনবাবু যাবজ্জীবন নির্বাসন দণ্ড প্রাপ্ত হন। বছর দশেক আন্দামান দ্বীপে নির্বাসন ভোগ করে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুক্তি লাভ করেন। সেই মুক্তির পরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। তবে নরেনবাবুর বিচিত্র বিপৎসংকুল জীবনের অতি সামান্যই এখানে বলা গেল। পূর্ববঙ্গের ভয়লেশহীন দামাল ছেলের মৃত্যু পুলিশের গুলিতে বা ফাঁসিতে হল না- কারাবাস থেকে মুক্ত হয়ে তার মৃত্যু ঘটল জীবন সংগ্রামে দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে!
লেখক: হীরালাল দাশগুপ্ত

তথ্যসূত্র:
১. স্বাধীনতা সংগ্রামে বরিশাল- হীরালাল দাশগুপ্ত, সাহিত্য সংসদ, কলিকাতা-৯, প্রকাশকাল মে ১৯৭২।


© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.