সত্যরঞ্জন নন্দী

 

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে স্কুল-কলেজ বর্জনের ঢেউ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। গোবিন্দপুর গ্রামের স্কুল থেকে একমাত্র সত্যরঞ্জনই ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি দিয়ে বেরিয়ে আসেন এবং নিজের গ্রামের নলিনীকান্ত করচৌধুরী, অখিলচন্দ্র দে, ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী প্রভৃতির সঙ্গে কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক হন। এই সময়ে তাঁর অগ্রজ মনোরঞ্জন নন্দী ঝালকাঠি সংগ্রেস অফিসে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তাতে সত্যরঞ্জন আরও উসাহিত হন।

 

এই বছর গান্ধিজি বরিশালে আসেন। বরিশালে অবলাকান্ত করচৌধুরীর মাধ্যমে সত্যরঞ্জন স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে সতীন্দ্রনাথ সেনের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাঁর সঙ্গে পটুয়াখালি চলে যান। সেখানে তিনি কংগ্রেস অফিসে থেকে নানা রাজনৈতিক কাজে লিপ্ত হন। এই সময়ে কাপড়ের দোকানে পিকেটিং করতে গিয়ে তিনি ধৃত হয়ে পটুয়াখালি সাব-জেলে কয়েকদিন আটক থাকেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের নেতৃত্বে স্বরাজ্যদল গঠিত হওয়ায় অসহযোগ আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে। অন্য আরও অনেকের মতো সত্যরঞ্জনও দেশে ফিরে এসে স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯২৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করেন। দুবছর পরে ১৯২৬ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে আই. এ. ক্লাসে ভর্তি হন। এই সময়ে বরিশাল শঙ্করমঠের সংস্পর্শে এসে তিনি বিপ্লবীদলভুক্ত হন। তখন হিমাংশুভূষণ বসুরায়ের (কালাদা) পরিচালনায় বরিশালে বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছিল। ব্রজমোহন কলেজে কেমিস্ট্রিতে অনার্স নিয়ে বি. এস. সি. পড়ার সময়ে সত্যরঞ্জন বি. পি. এস. এ. ছাত্র-সংগঠনের বরিশাল শাখার সভাপতি হন।

এই সময়ে শচীন করগুপ্ত, মুকুল সেন প্রভৃতি নূতন করে একটা আলাদা বিপ্লবীদল গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন। এই সংগঠনের অধিকাংশ কর্মীই মেছুয়াবাজার বোমার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে যান। মামলার সংস্রবে ধৃত জনৈক কর্মীর কাছে প্রাপ্ত জেলা সংগঠনের তালিকায় সত্যরঞ্জনের নাম পাওয়া যায়। বিশেষ করে এই কারণে পুলিশ ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে গ্রেপ্তার করে বরিশাল জেলে নিয়ে যায়। কিছুদিন বাদে পুলিশ সেখান থেকে তাঁকে স্বগৃহে অন্তরীণ রাখে।

তখন তিনি জেল-পলাতক নলিনী দাস, ফণী দাশগুপ্ত, শচীন করগুপ্ত ও অন্যান্য কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে গুপ্তভাবে বৈপ্লবিক কাজে লিপ্ত থাকেন এবং গ্রামে গ্রামে ব্যায়ামাগার ও সমিতি স্থাপন করে গুপ্ত সমিতির সক্রিয় কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। মাখন দত্তরায়, কানাইলাল চট্টোপাধ্যায়, কুলভূষণ নন্দী, অনন্ত দাস, অমূল্য মজুমদার, শশাঙ্ক রায়চৌধুরী, ক্ষিতীশচন্দ্র দত্ত, চিত্তরঞ্জন ঘোষ, সুখেন্দু দাস, যোগেশচন্দ্র দে প্রভৃতি ব্যক্তিগণ এই সময়ে বিপ্লবীদলভুক্ত হন।

এসব কারণে সত্যরঞ্জন ১৯৩২ সালে আবার গ্রেপ্তার হন ২৬ অক্টোবর তারিখে এবং বরিশাল জেল, ফরিদপুর জেল, প্রেসিডেন্সি জেল ও বহরমপুর ক্যাম্প জেলে কালাতিপাত করেন। বন্দী অবস্থায় বহরমপুর ক্যাম্প জেল থেকে তিনি বি. এ. পাশ করেন। তারপর বাঁকুড়া জেলার রানিবাঁধ ও মালদহ জেলার গাজল থানায় কিছুদিন অন্তরীণ থাকার পরে ১৯৩৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি মুক্তিলাভ করেন। মুক্তির পর তিনি কিছুদিন চন্দননগরে শিক্ষকতা করেন এবং পরে কলকাতার মার্টিন বার্ন কোম্পানিতে কাজ করে অবসর গ্রহণ করেন। তার দুই পুত্র- দীপঙ্কর নন্দী ও তীর্থঙ্কর নন্দী।

লেখক: হীরালাল দাশগুপ্ত

তথ্যসূত্র:

স্বাধীনতা সংগ্রামে বরিশাল- হীরালাল দাশগুপ্ত, সাহিত্য সংসদ, কলিকাতা-৯, প্রকাশকাল মে ১৯৭২।

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.