হরেকৃষ্ণ কোঙার

altজন্ম: ৫ আগস্ট ১৯১৫। বর্ধমান জেলার রায়না থানার কামারগড়িয়া গ্রামে। বাবার ব্যবসায়ের সূত্রে অল্প বয়সেই মেমারি থানার দক্ষিণ রাধাকান্তপুর গ্রামে চলে আসেন। বাবা : শরৎচন্দ্র কোঙার, মা : সত্যবালা দেবী। শৈশবেই কমরেড কোঙার রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। যখন তিনি স্কুলের ছাত্র তখন থেকেই তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে থাকেন।
১৯৩০ সালে শুরু হয় দেশব্যাপী আইন অমান্য আন্দোলন। কমরেড কোঙার তখন মেমারি বিদ্যাসাগর স্মৃতি বিদ্যামন্দিরের নবম শ্রেণীর ছাত্র। তিনি আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেন ও কারাবরণ করেন। হাইস্কুলের ছাত্র। এর পরবর্তীকালে তিনি, বিনয় চৌধুরী, সরোজ মুখার্জি প্রমুখ আব্দুল হালিমের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করেন এবং কমিউনিস্ট আদর্শের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেন। তিনি সরোজ মুখার্জি, বিনয় চৌধুরীর কাছ থেকে মার্কসবাদ ও শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদ সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে থাকেন। তখনও তিনি পুরোদমে বিপ্লববাদী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিপ্লববাদী কার্যকলাপের সময় তিনি ধরা পড়েন এবং ৬ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দন্ডিত হন। ১৯৩৩ সালে আন্দামানে নির্বাসিত হন। আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দী অবস্থায় তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ অধ্যয়ন করতে থাকেন। তিনি নারায়ণ রায়ের সংস্পর্শে আসেন এবং কমিউনিস্ট কনসলিডেশনে যোগ দেন। ১৯৩৮ সালের প্রথম দিকে তিনি মুক্তি পান। ওই বছরই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৩৮ সালে আন্দামান থেকে ফেরার পর প্রথমে তিনি কলকাতা ও হাওড়ায় পার্টির কাজকর্ম শুরু করেন। ১৯৩৮-৩৯ সালে বর্ধমানে যে শক্তিশালী ক্যানেল আন্দোলন চলেছিল তিনি সেই আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেন।
১৯৩৮ সালের ব্র্যাডলি থিসিস অনুযায়ী তখন কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের অভ্যন্তরে থেকেই কাজ করতেন। কলকাতা, বর্ধমান, হাওড়া এবং হুগলির কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার ভার ছিল তাঁর ওপরে। এই যোগাযোগ তাঁকে কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে বামপন্থী চিন্তার বিকাশ ঘটানোর যে সুযোগ এনে দিয়েছিল তিনি তার পূর্ণ ব্যবহার করেন।
১৯৫৩ সালের ১৭-২১ ডিসেম্বর কলকাতার মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে অনুষ্ঠিত অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য ষষ্ঠ সম্মেলন থেকে তিনি রাজ্য কমিটিতে নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালের ১৬-২১ জানুযারি ওই একই হলে অনুষ্ঠিত সপ্তম রাজ্য সম্মেলন থেকে রাজ্য সম্পদাকমণ্ডলী সদস্য হন। ১৯৫৮ সালে অমৃতসরে অনুষ্ঠিত পার্টির পঞ্চম বিশেষ কংগ্রেস থেকে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হন। পার্টির অভ্যন্তরে মতাদর্শগত বিতর্কের সময় ১৯৬১ সালের এপ্রিলে বিজয়ওয়াদায় অনুষ্ঠিত অবিভক্ত পার্টির ষষ্ঠ তথা শেষ কংগ্রেসে জাতীয় পরিষদে পশ্চিমবঙ্গের যে ১২ জন সদস্য নির্বাচিত হন তার অন্যতম ছিলেন হরেকৃষ্ণ কোঙার। এই জাতীয় পরিষদ পরে ২৫ জন সদস্যের যে কেন্দ্রীয় কমিটির গঠন করে, তিনি সেই কমিটিরও সদস্য হন।
১৯৫৭ সালে হরেকৃষ্ণ কোঙার কালনা (দ্বি আসন) কেন্দ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নির্বাচিত হন। তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৬৯, ১৯৭১ সালে তিনি কালনা কেন্দ্র থেকে বিধানসভায় নির্বাচিত হন।
১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময় ভারত সরকার কমরেড কোঙারকে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করে। ১৯৬৪ ও ১৯৬৬ সালেও তিনি একই কারণে গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৪ সালে সংশোধনবাদীদের পার্টি থেকে বিতাড়নের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  সি পি আই (এম)-এর প্রতিষ্ঠার সময়ই তিনি পার্টির রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী এবং পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৬৮ সালে অনুষ্ঠিত কোচিন কংগ্রেস এবং ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত মাদুরাই কংগ্রেস থেকে কমরেড কোঙার কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসাবে পুনঃনির্বাচিত হন। তিনি সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠতার সঙ্গে লড়াই করেন।
বর্ধমানের ক্যানেল আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কমরেড হরেকৃষ্ণ কোঙারের কৃষক আন্দোলনের হাতেখড়ি। এরপর তিনি আজীবন ছিলেন সারা ভারতের কৃষক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও নেতা। সারা ভারত কৃষকসভার মোগা সম্মেলন থেকে সর্ব প্রথম তিনি সি কে সি সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের ১৩-১৯ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের মোগাতে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর অমৃতরস সম্মেলন, মায়াভরম সম্মেলন ও ত্রিচুর সম্মেলন থেকে সি কে সি সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কৃষক সভার সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৬৮ সালে মাদুরাইতে অনুষ্ঠিত হয় কৃষক সভার উনিশতম সম্মেলন। এই সময় তিনি আত্মগোপন করেন। মাদুরাই সম্মেলন থেকে তিনি সারা ভারত কৃষক সভার সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। তখন থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত কোঙার সারা ভারত কৃষকসভার সম্পাদক ছিলেন। বরশুল সম্মেলন, পাঞ্জাবের রকা কালান সম্মেলন ও সবশেষে রাজস্থানের শিকার সম্মেলন থেকে কমরেড কোঙার এই পদে পুননির্বাচিত হন।
২৩ জুলাই ১৯৭৪-এ মাত্র ৫৯ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.