সুনীল রায়

altযখন ভারতমাতাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য এ উপমহাদেশের মানুষ সোচ্চার তখন সশস্ত্র বিপ্লববাদীরা প্রতিরোধ গড়ে ছিল সারা ভারতব্যাপী। চলছিল দেশকে স্বাধীন করার সব রকম প্রস্তুতি। ঠিক তখন সুনীল রায় জন্মেছিলেন, ১৯২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের শ্যামনগর গ্রামে। বেঁচে ছিলেন প্রায় ৮১ বছর। তিনি ২০০১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মারা যান। ৮১ বছর জীবনের প্রায় ৭০ বছর কেটেছে তার আন্দোলন-সংগ্রামে, কখনো জেলে বা আত্মগোপনে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ৮০’র দশকে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদে নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সালে পার্টি ভাঙ্গনের সময়ে তিনি বিলোপবাদীদের হাত থেকে পার্টিকে বাঁচাতে মতাদর্শিক সংগ্রাম চালান।
জন্মটাই তার আন্দোলন-সংগ্রামের উজ্জ্বলতম সময়ে। তখন ভারতমাতাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য এ উপমহাদেশের মানুষ স্বোচ্চার। শসস্ত্র বিপ্লববাদীরা প্রতিরোধ গড়ে ছিল সারা ভারতব্যাপী। চলছিল দেশকে স্বাধীন করার সব রকম প্রস্তুতি। ৯ বছরের শিশু সুনীল রায় যোগ দিলেন লবন সত্যাগ্রহ আন্দোলনে। যখন তিনি অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন তখন পারিবারিক অনটনের কারণে তাকে চাকুরি নিতে হয় নারায়নগঞ্জের চিত্তরঞ্জন কটন মিলে। মাত্র ১০ টাকা বেতন দিয়ে ঘোচাতে হয় সংসারের অভাব-অনটন। ১৯৩৮ সালে নিজ কর্মস্থলে শ্রমিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুরু হয় রাজনীতি পাঠ। যুক্ত হন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে।
লড়াই-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা বুঝতে চেষ্টা করেন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শনকে। ১৯৩৬-৩৯ সাল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে তিনি স্বদেশি আন্দোলন থেকে কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। চিত্তরঞ্জন কটন মিলে শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৪২ সালে শ্রমিকদের দাবি নিয়ে এক সমাবেশ তার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশ থেকে তাকে গ্রেফতার করে ৪ বছর জেলে আটক রাখা হয়। জেলের মধ্যে তাকে স্বাভাবিকভাবে রাখা হয়নি, নানারকম অত্যচার করা হয়েছে। কারণ একটাই তিনি কমিউনিস্ট।
১৯৪৬ সালে মুক্তি পান। ১৯৪৭ সালে তাকে এবং শ্রমিক নেতা আফসারকে মিল কর্তৃপক্ষ চাকুরিচ্যুত করে। এ কারণে শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দীর্ঘ ৩ মাস মিল বন্ধ করে রাখে। এ সময় এই ঘটনার প্রতিবাদে শুধু ওই মিল নয়, ঢাকার অধিকাংশ মিলে শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। এক পর্যায়ে ধর্মঘট ভাঙ্গতে পুলিশ-সেনাবাহিনী লেলিয়ে দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর গুলিতে ৮ জন শ্রমিক মারা যায়, আহত হয় ৮০ জনেরও বেশি।
১৯৪৯ সালে নানা পরিস্থিতির কারণে কমিউনিস্টরা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়। কমরেড সুনীল রায় শ্রমিক নেতা গোলজারকে নিয়ে আত্মগোপনে যান। গোলজারকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে গ্রেফতার হন তিনি। মুক্তি পেলেন ১৯৫০ সালে। কমিউনিস্ট পার্টি ও শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করার অভিযোগে ওই বছর মার্চে আবারো গ্রেফতার হন তিনি। ছাড়া পেলেন ১৯৫৩ সালে। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। কিন্তু পার্টির নির্দেশে তাকে আন্তরিকতার সাথে চলে যেতে হয় আদমজী জুট মিলে। উদ্দেশ্য একটাই শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলা, সংগঠিত করা। এ সময় তিনি আদমজীতে দুর্বার শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলেন।
একই সময় তিনি ঢাকার বিভিন্ন মিলে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। পোস্তাগোলা ১ নম্বর ঢাকেশ্বরী কটন মিল প্রাঙ্গণে সুনীল রায়ের নেতৃত্ব একটি বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বক্তব্য রেখেছিলেন। এরপর বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সমাবেশে সুনীল রায়কে সঙ্গে নিয়ে গেছেন।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয় লাভ করার পর সবখানে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়ে তিনি এই দাঙ্গা নিরসনে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। একই সময়ে পাকিস্তান পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। সুনিল রায় বাধ্য হয়ে আত্মগোপনে যায়।
১৯৬০ সালে আবার গ্রেফতার হন তিনি। এবার মুক্তি পেলেন ১৯৬৪ সালে। মুক্তি পাওয়ার পর সূত্রাপুরে বসবাস শুরু করেন। সূত্রাপুরে সে সময়ে জ্ঞান চক্রবর্তী, জিতেন ঘোষ, হাতেম আলীসহ অনেক পোড়-খাওয়া কমিউনিস্ট বসবাস করতেন। সরকারি নজরদারী এড়িয়ে সকল কমিউনিস্টকে খুব সাবধানে চলতে হতো। ১৯৬৯ সালে আবার সবার মতো তাকে আত্মগোপনে যেতে হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ৮০’র দশকে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদে নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সালে পার্টি ভাঙ্গনের সময়ে তিনি বিলোপবাদীদের হাত থেকে পার্টিকে বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৯৮ সালের শেষের দিকে তিনি কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তিনি আর কোনো দিন সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক জীবন শেষে ২০০১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।

লেখক: শেখ রফিক

তথ্যসূত্র:
১. সাপ্তাহিক একতা- ৬ সেপ্টেম্বর ২০০৮, ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯।
২. গণমানুষের মুক্তির আন্দোলনে- মাহফুজা খানম ও তপন কুমার দে, প্রকাশক: ডা. মাহফুজ শফিক, প্রকাশকাল ২১ ফেব্র“য়ারি ২০০৯।

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.